কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. বজলুর রশিদকে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ তুলে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তদন্ত ও তার নিয়োগ বাতিলের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম, কুড়িগ্রাম জেলা ইউনিট। অভিযোগপত্রে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মামলা বাণিজ্য,অনিয়ম এবং পেশাগত অযোগ্যতাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বরে পিপি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকেই অ্যাডভোকেট বজলুর রশিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে কুড়িগ্রামের আইনাঙ্গনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাষ্ট্রপক্ষের একজন গুরুত্বপূর্ণ আইন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ বিচার ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন মামলার পক্ষ-বিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ, মামলা পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার এবং বিচারপ্রার্থীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আইনজীবীদের মধ্যে আলোচিত।প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে মামলা নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে অর্থ লেনদেন এবং মামলার ফলাফলকে কেন্দ্র করে তদবিরের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে কুড়িগ্রাম শহরের একটি হত্যা মামলা ১৩জন আসামী করা হয়েছিল যার জি আর নং ২৬৬/২০০৬(কুড়ি) চার্জ শীট আসার পর নম্বর হয় দায়রা নং ১২৩/০৭। পরবর্তীতে তৎকালিন সরকার ২০১০ সালে রাজনৈতিক হত্যা কান্ড বিবেচনায় মামলাটি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল ।পরবর্তিতে ৫ আগষ্টের পর প্রত্যাহার করা সেই হত্যা মামলাটি নতুন ভাবে উদ্দেশ্য প্রনোদিত হয়ে একটি মহলের যোগসাজসে মোট ৭৭জনের নাম উল্লেখ এবং আরো অজ্ঞাত ২৫০-৩০০ জনকে আসামি করে পিপি বজলুর রশিদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় হত্যা মামলার রুজু করা হয়। যার জি আর নম্বর ১৪৪/২৫(কুড়ি)। এ মামলার ভয় দেখিয়ে তিনি শত শত নিরীহ ও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন। এই মামলাটি সম্প্রতি কুড়িগ্রাম থানা পুলিশ চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে।
এছাড়াও মস্তিষ্কের ক্যান্সারে আক্রান্ত দীর্ঘদিন পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করা আশিক নামের এক যুবককে জুলাই আন্দোলনের শহীদ দেখিয়ে দায়েরকৃত হত্যা মামলায় ফাঁসানোর কিংবা গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বজলুর রশিদ শত শত সাধারণ নিরীহ মানুষের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা পকেটস্থ করেছেন। যার জি আর নং ৩১৯/২৪।আসামী করা হয়েছিল ১০৪ । চার্জশীট ভুক্ত করা হয়েছে ১১৮জন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, পিপি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে বজলুর রশিদ একটি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। কিন্তু দায়িত্ব পাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন । ভিতরবন্ধ গ্রামের বাড়ীতে বহুতল ভবন নির্মাণ, একাধিক স্থাবর সম্পত্তি অর্জন এবং নিজ ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ জমা রাখার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রের তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, অতীতে তিনি জামায়াতপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে রাজনৈতিক সুবিধা নিয়েছেন। এমনকি ১২ ফেব্রুয়ারী নিবার্চনে এনসিপি জামাত সমর্থিত প্রার্থীদের পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করার অভিযোগও করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পিপি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে তার সেশন জজ আদালতে সেশন ট্রায়ালের কোন প্রকার অভিঙ্গতা তার ছিল না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ মামলা পরিচালনায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে বার বার প্রশ্ন উঠেছে।এছাড়াও তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় স্বামী স্ত্রী ,শ্যালক দুলা ভাই,আওয়ামীলীগ এর জড়িতদেরও পিপি শীপে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির কুড়িগ্রাম এর সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আশরাফ আলী বলেন, আমরা ব্যক্তিগত কোনো বিরোধের কারণে এই অভিযোগ করিনি। কুড়িগ্রামের আইনাঙ্গনের বহু আইনজীবীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন জমে আছে, তারই প্রতিফলন এই অভিযোগপত্র। একজন পাবলিক প্রসিকিউটরের বিরুদ্ধে যখন অবৈধ সম্পদ অর্জন, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার, অযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগে প্রভাব বিস্তার এবং বিচার কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাবের মতো অভিযোগ ওঠে, তখন তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিচার বিভাগকে কোনোভাবেই বিতর্কিত ব্যক্তিদের হাতে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।
এ ব্যাপারে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির কুড়িগ্রাম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বলেন,রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইন কর্মকর্তার পদ অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও দায়িত্বশীল। কিন্তু কুড়িগ্রামে বর্তমান পিপির বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কোনো সাধারণ অভিযোগ নয়। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক সুবিধাবাদ এবং মামলা বাণিজ্যের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে আইনজীবী সমাজে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। এ ব্যাপারে পিপি বজলুর রশীদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার হাতে সময় নেই তাই এই প্রতিবেদকের সাথে কোন কথা বলতে রাজি হননি।