বাংলাদেশে পাসপোর্ট সেবায় সংকট দীর্ঘদিনের। ক্রমাগত চলতে থাকা এসব সংকট যেন স্থায়ী রূপ ধারণ করেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা প্রত্যাশীদের মধ্যে প্রতিনিয়তই ভোগান্তিতে পড়তে দেখা যায়। পাসপোর্ট সেবাকে সহজ করতে এবং নাগরিকদের হয়রানি কমাতে পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দেশের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসগুলোতে ভোগান্তির চিত্র পুরোপুরি বদলায়নি। জাতীয় পরিচয়পত্র ও অনলাইন জন্মনিবন্ধনের ওপর ভিত্তি করে পাসপোর্ট ইস্যুর নিয়ম চালু হওয়ায় বড় একটি অংশের ঘুষ বাণিজ্য বন্ধ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী, আনসার সদস্য এবং বাইরের দালাল চক্র মিলে গড়ে তুলেছে নতুন ধরনের পকেট সিন্ডিকেট। সরাসরি আবেদন করতে যাওয়া নাগরিকদের ফাইলে খুঁটিনাটি ভুল ধরে ফিরিয়ে দেওয়া এবং দালালের মাধ্যমে এলে মুহূর্তেই কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার এক অলিখিত নিয়ম চলছে দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক কার্যালয়ে। নরসিংদী, যশোর, চট্টগ্রাম, মুন্সীগঞ্জ ও সিলেটের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রযুক্তির সুবিধা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় দালাল ও তাদের সহযোগী কম্পিউটার দোকানগুলো। আঞ্চলিক অফিসগুলোর অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নরসিংদীতে প্রতিদিন জমা পড়া আবেদনের একটি বড় অংশই যাচ্ছে তথাকথিত ‘চ্যানেল ফি’র মাধ্যমে, যেখানে সরকারি ফির বাইরে দালালেরা ৮ থেকে ১৬ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নিচ্ছে। সরাসরি আবেদন করতে গেলে নানাবিধ ভুলের অজুহাতে ফাইল আটকে দেওয়া হলেও দালালের মাধ্যমে এলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়। একই চিত্র দেখা গেছে যশোর অঞ্চলেও, যেখানে কর্মকর্তা ও দালালদের মধ্যে ‘ভিআইপি’ ও ‘নরমাল’ চ্যানেলের মতো সাংকেতিক ভাষা চালু রয়েছে। সাধারণ নিয়মে আসা গ্রাহকরা দিনের পর দিন ঘুরলেও দালালের হাত ঘুরে আসা ফাইল কোনো প্রশ্ন ছাড়াই জমা হয়ে যায়। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় ও আঞ্চলিক অফিসে অবস্থা এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, প্রায় ৯৫ শতাংশ আবেদনকারী বাধ্য হয়ে দালালের শরণাপন্ন হচ্ছেন। সেখানে টাকা আদায়ের পর ফাইলের ওপর একটি বিশেষ ‘চিহ্ন বা মার্কা’ দিয়ে দেওয়া হয়, যা দেখে ভেতরের কর্মকর্তারা ফাইল দ্রুত জমা নেন। মুন্সীগঞ্জে আবার ই-পাসপোর্ট অনলাইন হওয়ার পর দালালির ধরণ বদলে গেছে; সেখানে অফিসের সামনের কম্পিউটারের দোকানগুলোই এখন প্রধান দালালের ভূমিকা পালন করছে এবং টাকার বিনিময়ে ভুয়া জন্মসনদ তৈরি করে বয়স জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্ট করানোর মতো ঘটনা ঘটছে। সিলেট অফিসে অতীতে বড় বড় দুর্নীতির কারণে শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং প্রশাসনিক কড়াকড়ি বাড়ানো হলেও অফিসের বাইরে থাকা দালালদের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি, যারা ট্রাভেল এজেন্সির আড়ালে বিশেষ করে বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসের ভেতর ও বাইরে ঘাপটি মেরে থাকা এই দালালদের অতিরিক্ত টাকা দিলে ফাইল দ্রুত নড়াচড়া করে বা পাসপোর্ট দ্রুত প্রিন্ট হয়ে আসে। সাধারণ আবেদনকারীরা যেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে বা কাউন্টারে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে কোনো সদুত্তর পাচ্ছেন না, সেখানে দালালদের মাধ্যমে ফাইল জমা দিলে কোনো ঝামেলাই পোহাতে হচ্ছে না। রাজধানীর আগারগাঁওসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভুক্তভোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশ মানুষ তাদের নির্ধারিত ডেলিভারির তারিখ পার হওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহ পরও পাসপোর্ট হাতে পাননি। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে তাদের বার বার অফিসে এসে ধর্ণা দিতে হচ্ছে, যা কর্মঘণ্টা নষ্টের পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে পাসপোর্ট সেবাকে গতিশীল করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ তুলে দেওয়ায় ঢাকার আগারগাঁওসহ বিভিন্ন স্থানে আবেদনকারীরা পুলিশি হয়রানি থেকে রক্ষা পেয়ে দ্রুততম সময়ে পাসপোর্ট হাতে পাচ্ছেন। তবে এই স্বস্তির মধ্যেও রাজধানীসহ বড় অফিসগুলোতে আঙুলের ছাপ বা ছবি তোলার আগে প্রাথমিক কাগজপত্র যাচাইয়ের কাউন্টারে তীব্র জনবল সংকট দেখা গেছে, যার ফলে সাধারণ মানুষকে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এছাড়া, সার্ভার জটিলতা ও কারিগরি ত্রুটির কারণেও পাসপোর্ট সেবা প্রত্যাশীরা প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। প্রায়শই দেশের প্রধান সার্ভারে সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকা বা তথ্য আপডেট না হওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদনকারী বায়োমেট্রিক ও ছবি তোলার পর সার্ভারের ত্রুটির কারণে আবার নতুন করে তারিখ দেওয়া হচ্ছে, যা গ্রাম থেকে আসা মানুষগুলোর জন্য অসহনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কেন বা কোন কারণে ফাইল আটকে আছে, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা বা সুনির্দিষ্ট আপডেট পাসপোর্ট অফিস থেকে দেওয়া হয় না। ওয়েবসাইটে ‘পেন্ডিং’ স্ট্যাটাস ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না, যা সাধারণ মানুষকে আরও বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। সেবা প্রত্যাশীরা চান যাতে এই সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং পাসপোর্ট অফিসগুলো দালালমুক্ত করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বিশ্লেষকদের মতে, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়মের আধুনিকায়ন হলেও, স্থানীয় আঞ্চলিক অফিসগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে থাকা প্রশাসনিক দুর্নীতি ও দালাল সিন্ডিকেট উপড়ে ফেলা না গেলে পাসপোর্ট সেবার প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো অধরাই থেকে যাবে।