সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা চেষ্টা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, আরিফুল হক-বাবরসহ খালাস ৯

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৭:১৮ পিএম
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত হত্যা চেষ্টা মামলায় একজনের মৃত্যুদণ্ড, আরিফুল হক-বাবরসহ খালাস ৯

সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা ও সাবেক মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যাচেষ্টা মামলায় একজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে সিলেটের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এবং সাবেক হুইপ জি কে গউছসহ ৯ জনকে খালাস দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় ঘোষণা করেন।

রায়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি হলেন সৈয়দ নাইম আহমদ ওরফে নিমু, যিনি হাফিজ নাইম নামেও পরিচিত। আদালত সূত্র ও রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সাক্ষ্য-প্রমাণে প্রমাণিত হওয়ায় সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে তাকে ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ডও করা হয়েছে। তবে একই মামলায় অভিযুক্ত প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দিয়েছেন আদালত।

আলোচিত এই মামলার সূত্রপাত ২০০৪ সালের ২১ জুন। সেদিন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে একটি রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। ওই সময় সমাবেশে গ্রেনেড হামলা হয়। হামলায় যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন, আহত হন অন্তত ২৯ জন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনার পর দিরাই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা করেন।

তদন্তের দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে বিভিন্ন সময়ে আরিফুল হক চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, জি কে গউছসহ একাধিক ব্যক্তির নাম অভিযোগপত্রে আসে। পরে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর আদালত ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। পরবর্তী সময়ে মামলার এক আসামি মাওলানা শেখ আবদুস সালাম মারা গেলে তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আদালতে মোট ১২৩ জন সাক্ষীর তালিকা থাকলেও ৬৭ জন সাক্ষ্য দেন।

সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি আবুল হোসেন বলেন, “দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত রায় দিয়েছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই একজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।” রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, বিচারিক প্রক্রিয়ায় উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই আদালত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

অন্যদিকে খালাস পাওয়া আসামিদের পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, মামলায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের জড়ানো হয়েছিল। রায় ঘোষণার পর আদালত প্রাঙ্গণে আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, “ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমাদের এ মামলায় জড়ানো হয়েছিল। দীর্ঘদিন হয়রানি সহ্য করতে হয়েছে। আজ আমরা নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি।” একই সুরে লুৎফুজ্জামান বাবরও দাবি করেন, তাকে একের পর এক মামলায় জড়ানো হয়েছিল রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে।

জি কে গউছও রায়ের পর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালত স্বাধীনভাবে সত্যের ভিত্তিতে মামলাটি নিষ্পত্তি করেছেন। তার ভাষায়, “সাড়ে ২৬ মাস আমি এবং আরিফ ভাই বিভিন্ন কারাগারে মানবেতর জীবন কাটিয়েছি। আজ আদালতে আমরা বেকসুর খালাস পেয়েছি।”

তবে রায়ে সন্তুষ্ট নন মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নাইম আহমদের পরিবার। আদালত প্রাঙ্গণে তার ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ সাংবাদিকদের জানান, এই রায়ের বিরুদ্ধে তারা উচ্চ আদালতে আপিল করবেন।

দীর্ঘ দুই দশক পর আসা এই রায় পুরোনো রাজনৈতিক সহিংসতার একটি বহুল আলোচিত মামলার নিষ্পত্তি হলেও, এর প্রতিক্রিয়া এখানেই থামছে না। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষ এটিকে বিচারিক সাফল্য বলছে, অন্যদিকে খালাস পাওয়া আসামিরা এটিকে রাজনৈতিক হয়রানির মামলার অবসান হিসেবে দেখছেন। ফলে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে নতুন আইনি লড়াইয়ের দিকেও গড়াতে পারে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে