রাজধানী ঢাকার অলিগলি, কাঁচাবাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ড্রেন ও আবাসিকের আশপাশে ইঁদুরের উপদ্রব বেড়েছে। আর তাতে বাড়ছে রাজধানীবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও। কারণ বিভিন্ন রোগ জীবাণুর বাহক ইঁদুর। তাদের মলমূত্র ও শরীরের সংস্পর্শে খাবার বা পানি দূষিত হলে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগর এলাকায় ওই ঝুঁকি আরো বেশি। বর্তমানে দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে রাজধানীতে ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ইঁদুরের বংশবিস্তার। অথচ নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার অন্যতম প্রধান শর্তই হলো বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। কিন্তু দেশে এখনো গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি কার্যকর ও আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। ফলে নগরীতে ক্রমেই বাড়ছে ইঁদুর, মশা ও রোগবাহক অন্যান্য প্রাণীর উপদ্রব। প্রাণী বিজ্ঞানী এবং স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে ইঁদুর থেকে, হান্টা ভাইরাস ছাড়াও অন্তত ৬০ ধরনের রোগ বিভিন্নভাবে মানুষের দেহে ছড়াতে পারে। ইঁদুর অত্যন্ত অভিযোজনক্ষম ও বুদ্ধিমান স্তন্যপায়ী প্রাণী। এর বাস মূলত মানুষের বসতবাড়ির আশপাশের পরিবেশে। সাধারণত গর্ত, ড্রেন, নর্দমা, আবর্জনার স্তূপ, গুদামঘর, রান্নাঘরের ফাঁকফোকর কিংবা দেয়ালের ফাটলের মতো অন্ধকার ও নির্জন স্থান ইঁদুরের বসবাসের জন্য উপযোগী। ইঁদুরের প্রধান দুটি প্রজাতি হলো বড় আকারের ব্রাউন র্যাট ও গৃহস্থালি বা ছাদের ইঁদুর। তবে বিভিন্ন পরিবেশে আরো নানা প্রজাতির ইঁদুর রয়েছে। সর্বভুক প্রাণী হওয়ায় এরা শস্যদানা, চাল, গম, ফলমূল, সবজি, খাদ্যবর্জ্য এমনকি পচা জৈব পদার্থও খেয়ে বেঁচে থাকতে পারে। আর অপরিচ্ছন্ন ও বর্জ্যপূর্ণ পরিবেশে ইঁদুর দ্রুত বংশবিস্তার করে।
সূত্র জানায়, দেশে একসময় গ্রামাঞ্চলে কৃষকের খেতের ধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন শস্য রক্ষায় ইঁদুরের উপদ্রব ছিলো। তাই ফসল রক্ষায় এসব প্রাণীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাড়তি শ্রম ও অতিরিক্ত ব্যয় হতো। তবে বর্তমানে কীটনাশকের ব্যবহারের ফলে গ্রামাঞ্চলে ইঁদুরের উপদ্রব আগের তুলনায় কমেছে। বিপরীতে শহরাঞ্চলে, বিশেষ করে রাজধানীতে ইঁদুরের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে। ঢাকার কাঁচাবাজার, আবর্জনার স্তূপ এবং আধুনিক আবাসিক ভবনেও এখন ইঁদুরের বিচরণ চোখে পড়ে। মূলত নগরজীবনের অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও খাদ্যবর্জ্যরে সহজলভ্যতায় শহরে ইঁদুরের আধিপত্য বৃদ্ধি বা বংশবিস্তার বেড়েছে। তাছাড়া প্লাস্টিকসহ নানা বর্জ্যে ড্রেন, নালা-নর্দমা ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি দ্রুত নগরায়ণের ফলে জলাভূমি ও খোলা জায়গা কমে যাওয়ায় ইঁদুর তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছেড়ে হয়েছে শহরমুখী।
সূত্র আরো জানায়, খাবারের প্রাপ্যতা বাড়লে যে কোনো প্রাণী বা কীটপতঙ্গের সংখ্যাও বাড়ে। রাজধানীতে ইঁদুরের অস্বাভাবিক বাড়ার পেছনেও একই কারণ কাজ করছে। নগরীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার, রাস্তার পাশে ও আবাসিক এলাকায় জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, অব্যবস্থাপিত বর্জ্য এবং পড়ে থাকা শস্যবর্জ্য ইঁদুরের জন্য সহজলভ্য খাদ্য সরবরাহ করছে। ফলে প্রাণীটির দ্রুত বংশবিস্তার হচ্ছে। শুধু বাজার বা খোলা স্থানেই নয়, ঢাকার বাসাবাড়িতেও ইঁদুরের উপস্থিতি বেড়েছে। আর এভাবে ইঁদুর বাড়তে থাকলে একসময় নগরীতে সাপের সংখ্যাও বাড়তে পারে। কারণ সাপের খাবার হলো ইঁদুর।
এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঁদুর বিভিন্ন রোগ-জীবাণুর বাহক। তাদের মল, মূত্র ও শরীরের সংস্পর্শের মাধ্যমে মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যদ্রব্য দূষিত হওয়া, পানির উৎস দূষণ এবং ঘরের পরিবেশ অস্বাস্থ্যকর হয়ে পড়াসহ বহুমাত্রিক ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে ইঁদুরের পাশাপাশি মশা, মাছি ও অন্যান্য রোগবাহী প্রাণীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। যা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ইঁদুর থেকে হান্টা ভাইরাস ও লেপ্টোস্পাইরোসিসের মতো জীবননাশী রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাশাপাশি পরোক্ষভাবে বাতজ্বর ও টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ-জীবাণু বিস্তারেও প্রাণীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া ইঁদুরের পাশাপাশি চিকাও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। যদিও অনেকেই ইঁদুর ও চিকার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। অথচ চিকার কামড়ে জলাতঙ্ক (র্যাবিস) হতে পারে, যা চিকিৎসা না নিলে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু। আর হান্টা ভাইরাসের চেয়েও চিকার মাধ্যমে ছড়ানো র্যাবিস ভাইরাস বেশি ভয়ংকর।
এদিকে এ প্রসঙ্গে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল হাসান সিদ্দিকী জানান, ইঁদুরের মাধ্যমে সাধারণত হান্টা ভাইরাস ছড়ায় এবং বাংলাদেশেও এ ভাইরাসের উপস্থিতি রয়েছে। তবে এর ভ্যারিয়েন্টটি তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালী। তা সত্ত্বেও ঝুঁকি একেবারে উড়িয়ে দেয়ার সুযোগ নেই। ইঁদুর শুধু ভাইরাসই নয়, বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়াও ছড়ায়। এর শরীর, লোম, মলমূত্র থেকে এসব জীবাণু সরাসরি বা বাতাসের মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে, এমনকি খাদ্যদ্রব্যের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। তাছাড়া ইঁদুর সরাসরি টাইফয়েডের জীবাণু বহন না করলেও যদি কোনো খাদ্য বা বাসনপত্রের ওপর দিয়ে হাঁটে, তখন তার শরীরে থাকা জীবাণুটি সেসবের সঙ্গে লেগে যেতে পারে। ফলে মানুষ পরোক্ষভাবে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নিয়ামুল নাসের জানান, রাজধানীতে ইঁদুর বেড়েছে এটা নিশ্চিত। রাজধানীর যেকোনো কাঁচাবাজার এলাকায় গেলেই দিনদুপুরে বড় বড় ইঁদুর দেখা যায়। হাতিরপুল, কারওয়ান বাজার ও শ্যামবাজারে গেলে তো প্রচুর দেখা মেলে।
এ প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ফাহমিদা পারভীন জানান, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রথম ও প্রধান শর্ত হলো উৎস থেকেই বর্জ্য আলাদা করা। তারপর তা বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করে নির্ধারিত ল্যান্ডফিলে নিয়ে যাওয়া এবং পরে তা সম্পদে রূপান—র করা। পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন বর্জ্য বলে কিছু নেই, সবই সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ঢাকায় মাছের আঁশ, শাকসবজির বর্জ্য, পুরনো কাপড়, এমনকি ওষুধের বোতল সব একসঙ্গে সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ সমস্যার শুরুটাই গোড়া থেকে। দ্রুত কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে ইঁদুর ও মশা-মাছির মতো রোগবাহক প্রাণীর বিস্তার আরো বাড়বে। যা নগরবাসীর জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার জানান, উৎস থেকে বর্জ্য আলাদা করে সংগ্রহ করাই সঠিক পদ্ধতি কিন্তুএক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি। তবে নগরবাসীর সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে কিছু ওয়ার্ডে পরীক্ষামূলকভাবে উৎসভিত্তিক বর্জ্য পৃথককরণ কার্যক্রম শুরু করা হবে, যা ধীরে ধীরে পুরো নগরীতে সমপ্রসারণের লক্ষ্য রয়েছে।