সরকারি নজরদারির বাইরে দেশের নদীপথে বিপুলসংখ্যক নৌযান। বর্তমানে দেশের নদনদীতে আড়াই লাখের বেশি ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল করছে। কিন্তু ওসব নৌযানের মাত্র ২২ হাজারের কিছু বেশি নিবন্ধিত। সম্প্রতি দেশে নদনদীতে চলাচলরত নৌযানের বিষয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) নৌযান শুমারি ২০২৬-এর লিস্টিং অপারেশন শুরু করে। ওই জরিপের প্রাথমিক হিসাবে দেশে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৮০৮টি ইঞ্জিনচালিত নৌযান পাওয়া গেছে। তার মধ্যে ঘাটভিত্তিক নৌযান ১ লাখ ৭৪ হাজার ৪৭টি এবং অন্যান্যভাবে ৭০ হাজার ৭৬১টি নৌযান তালিকাভুক্ত হয়েছে। আর ওসব নৌযানের মধ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) রয়েছে মাত্র ৮২ হাজার ৮ জন চালকের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং নৌপরিবহন অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে মোট নিবন্ধিত রয়েছে মাত্র ২২ হাজার ৫৫২টি নৌযান। কিন্তু নৌযান জরিপের তথ্যানুাযায়ী নদ-নদীতে চলাচলকারী নৌযানের সংখ্যা তারচেয়ে প্রায় ১১ গুণ বেশি। আর নিবন্ধনহীন ওসব নৌযান কার্যত সরকারি নজরদারির বাইরে ছিলো। দীর্ঘদিন ধরে দেশে বিপুলসংখ্যক নৌযান চলাচল করলেও এতোদিন সেগুলোর সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য ছিলো না। তবে বিবিএসের সাম্প্রতিক লিস্টিং কার্যক্রম ওই ঘাটতি পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র জানায়, দেশে নৌযানের বিস্তারিত শুমারি শুরু হবে আগামী আগস্ট থেকে। তখন নৌযানের ধরন, ইঞ্জিনের সক্ষমতা, কত জনবল নিয়োজিত আছে, কোন রুটে কত নৌযান চলাচল করে তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া মিলবে। ফলে সরকারের পক্ষে নৌপথে শৃঙ্খলা আনা, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে সহায়ক হবে। বিবিএসের প্রাথমিক লিস্টিং অপারেশনে উঠে এসেছে ২৫ ধরনের নৌযানের তথ্য। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাছ ধরার ট্রলার। তার সংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৯৫৭টি। তাছাড়া ১ হাজার ৪৫০টি যাত্রীবাহী জাহাজ এবং ৪৩ হাজার ৭৯২টি যাত্রীবাহী বোট রয়েছে। আর অন্যান্য নৌযানের মধ্যে রয়েছে বালবাহী ১০ হাজার ২৭১টি নৌযান, ৪০ মিটারের ঊর্ধ্বে মালবাহী ৭ হাজার ৮৩৯ নৌযান, ৪০ মিটারের নিচে পণ্যবাহী ২৩ হাজার ৮০৪টি নৌযান, তেলবাহী ২৮৪টি নৌযান, ড্রেজার ১ হাজার ৬০৩টি, ডাম্ববার্জ ২০৪টি, ইঞ্জিন বার্জ ৫৫৬টি, কাটার সাকশন ড্রেজার ১৬০টি, টাগবোট ১০৮টি, স্পিডবোট ১ হাজার ৭১৩টি, ফেরি ৪২৩টি, ক্রেনবোট ৮৪টি, পরিদর্শন বোট ১৮১টি, ট্যুরিস্ট লঞ্চ ৬৪টি, ট্যুরিস্ট বোট ১ হাজার ৬৪টি, হাউজবোট ৩৭৮, ওয়াটার ট্যাক্সি ৩৫টি, ফ্লোটিং পাম্প ৩৭টি, পন্টুন ৭৫৪টি, ফ্লোটিং হাসপাতাল ৮টি এবং গ্যাসবাহী নৌযান ৮টি। তবে এ শুমারির আওতার বাইরে ছিল সাধারণ নৌকা, সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত নৌযান এবং তাদের মালিকানাধীন অন্যান্য সংস্থায় ব্যবহৃত নৌযান।
সূত্র আরো জানায়, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত নৌযান শুমারির লিস্টিং কার্যক্রম চলতি বছরের ৪ থেকে ১৭ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী পরিচালিত হয়। তাতে মাঠপর্যায়ে ১ হাজার ৪৪৯ জন তথ্যসংগ্রহকারী কাজ করেন। কিন্তু নৌযানের তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে তথ্যসংগ্রহকারীদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে। কারণ পার্বত্য এলাকা, হাওড়-বিল ও চরাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা নৌযানের তথ্য সংগ্রহ, মাঝ নদী বা সমুদ্রে অবস্থানরত নৌযানের তথ্য নেয়া কঠিন ছিলো। তাছাড়া অনেক নৌযান মালিকের মধ্যে নিবন্ধন নিয়ে অনীহা, কর আরোপের আশঙ্কা, প্রশাসনিক ঝামেলার ভয় এবং তথ্য গোপনের প্রবণতাও ছিল। পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় (যেমন মহেশখালী, টেকনাফ) প্রবেশে জটিলতা, অবৈধ কাজে ব্যবহৃত নৌযানের তথ্য সংগ্রহ, লিজ দেয়া নৌযানের প্রকৃত মালিক শনাক্ত করাও।
এদিকে নৌপরিবহন অধিদপ্তর সংশ্লিষ্টদের মতে, নৌযান শুমারির মাধ্যমে প্রথমবারের মতো দেশের নৌখাতের একটি বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। পূর্ণাঙ্গ শুমারি সম্পন্ন হলে নৌপথ ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ও পরিকল্পনায় বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।