বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার সমপ্রসারণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশী মিশনগুলো

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ২৮ জুন, ২০২৬, ১০:৩০ এএম | প্রকাশ: ২৮ জুন, ২০২৬, ১০:৩০ এএম
বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার সমপ্রসারণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশী মিশনগুলো

বহির্বিশ্বে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে বাংলাদেশী মিশনগুলো। এমনকি দূতাবাসগুলোর একগুঁয়েমি চিঠির দরুন অনেক ক্ষেত্রেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় শ্রমবাজারের দুয়ার। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের জনশক্তি রফতানি খাতে লেগেছে ভাটার টান। পরিস্থিতি উন্নয়নে বিদেশে শ্রমবাজার সমপ্রসারণের স্বার্থে মিশনে কর্মরত কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং যুদ্ধপরিস্থিতিতে জনশক্তি রফতানিতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সরকার চলতি অর্থবছরে জনশক্তি রফতানি খাতকে চাঙ্গা এবং শ্রমবাজার সমপ্রসারণের লক্ষ্যে বহির্বিশ্বে প্রায় ১৪ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ওই লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব হলে জনশক্তি রফতানি খাতে অর্জিত হবে অভাবনীয় সাফল্য। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি রফতানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, আসন্ন নতুন অর্থবছরে সরকার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আনুমানিক ১৪ লাখ বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। যদিও বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের কারণে বিদেশে জনশক্তি রফতানিতে ধস নেমেছে। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী কঠোর পরিশ্রম করে দেশে পাঠাচ্ছে প্রচুর রেমিট্যান্স। আর ওই রেমিট্যান্স মজবুত রাখছে জাতীয় অর্থনীতির ভিতকে। রেমিট্যান্স আরো বাড়াতে জনশক্তি রফতানির খাতকে সমপ্রসারণে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। কিন্তু বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও চরম উদাসীনতায় বন্ধকৃত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। বিগত ২০২৫ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান লাভ করেছে মোট ৯ লাখ ৩৩ হাজার ৮১৫ জন বাংলাদেশী কর্মী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ ও পেশাদার কর্মী পাঠানোর মাধ্যমে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সমপ্রসারণে নিরলস প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। যেসব দেশে বর্তমানে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ বন্ধ বা সীমিত রয়েছে, সেসব দেশের শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত ও সমপ্রসারণের জন্য সরকারের কূটনৈতিক আলোচনা ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চলমান রয়েছে।

সূত্র জানায়, চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশী বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য গেছেন। আগের বছরের একই সময়ে ওই সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা প্রায় ৪১ শতাংশ কমেছে। তবে গত ১ জানুয়ারি থেকে গত ৫ জুন পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে ৩ লাখ ১৭ হাজার ১৭৪ নারী-পুরুষ কর্মী বিদেশে কর্মসংস্থান লাভ করেছে। তার মধ্যে সউদী আরবে ১ লাখ ৯১ হাজার ৮৩৭জন চাকরি লাভ করেছে। সিঙ্গাপুরে চাকরি লাভ করেছে ২৯ হাজার ৫৬৩জন এবং কাতারে চাকরি লাভ করেছে ২৩ হাজার ৯২৪জন। অথচ ২০২৫ সালে একই সময়ে ওই দেশগুলোতে চাকরি লাভ করেছিলো যথাক্রমে সউদীতে ৩ লাখ ২৭ হাজার ১৪১ জন, সিঙ্গাপুরে ২৭ হাজার ২৪৭ জন এবং কাতারে চাকরি লাভ করেছে ৪২ হাজার ৫৪৮ জন। কিন্তু চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সামরিক হামলার মধ্যে দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার জেরে সৃষ্ট অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। 

সূত্র আরো জানায়, বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যুর ক্ষেত্রে বিএমইটিতে সিন্ডিকেট চক্রের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি এবং ঘুষ ছাড়া ফাইল না নড়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বর্তমানে বিএমইটিতে তলানিতে পৌঁছেছে প্রতিদিন বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যু কার্যক্রম। বিএমইটি থেকে আগে দৈনিক প্রায় ৬ হাজার বহির্গমন ছাড়পত্র ইস্যু হলেও এখন ওই সংখ্যা মাত্র ৭/৮শ’তে নেমে এসেছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং তদবির বাণিজ্যের কারণে এক সপ্তাহেও মিলছে না অনেক বিদেশগামী কর্মীর বহির্গমন ছাড়পত্র। বৈধ ভিসা এবং সত্যায়ন থাকার পরেও যথাসময়ে বহির্গমন ছাড়পত্র হাতে না পাওয়ায় বাতিল হচ্ছে বিদেশগামী কর্মীদের ফ্লাইটের টিকিট। তাতে বিদেশগামী কর্মীদের গচ্চা দিতে হচ্ছে। বর্তমানে বিএমইটির ইমিগ্রেশন বিভাগের কার্যক্রম সিন্ডিকেট চক্রের তদবির ও ইশারায় চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দ্রুত মিলছে না অনেকেরই বহির্গমন ছাড়পত্র। তাছাড়া সিদ্ধান্তহীনতার কারণে পূর্ব এশিয়ার সম্ভাবনাময় শ্রমবাজার লাউসের প্রায় ১ হাজার ভিসা বাজারে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভিয়েতনামস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি চিঠির কারণে দেশটিতে বাংলাদেশী বৈধ কর্মী চাহিদাপত্র এবং ভিসা পাওয়ার পরেও বহির্গমন ছাড়পত্র বন্ধ রাখা হয়েছে। লাউসে প্রচুর বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা রয়েছে। কিন্তু বহির্গমন ছাড়পত্র পাওয়ার জটিলতায় দেশটির শ্রমবাজার হাতছাড়া হবার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

এদিকে বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক প্রেরণ প্রক্রিয়ায় অসম ভিসা বাণিজ্য, দক্ষ কর্মীর ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধানে ধীরগতি বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি অনেক গন্তব্য দেশে শ্রমনীতি পরিবর্তন ও নিরাপত্তাজনিত কারণে কমে যাচ্ছে নতুন কর্মী নিয়োগের হারও। তারপরও সউদী আরবসহ বিভিন্ন দেশের যেটুকু ভিসা চলমান রয়েছে তা বিএমইটি কেন্দ্রিক আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর তার সরাসরি প্রভাব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশগামী কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি সমপ্রসারণ, নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বিদেশে মিশনগুলোর তৎপরতা বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। কারণ রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। 

অন্যদিকে বৈদেশিক কর্মসংস্থান কমলেও রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী চলতি বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত তিন মাসে ১ হাজার ৩০ কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার মার্কিন ডলার সমপরিমাণ রেমিট্যান্স বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে এসেছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে চলতি জুন মাসের শুরুতে দেশে প্রবাসী আয়ে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য্নুযায়ী, চলতি জুন মাসের প্রথম ছয় দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৬৮ কোটি ৩৪ লাখ মার্কিন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০.৭৮ শতাংশ কম। গত বছরের জুন মাসের একই সময়ে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৮৬ কোটি ২৬ লাখ ডলারের বেশি।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে