চিরিরবন্দরে ব্যতিক্রমি শখ ও মনের মানুষ একজন ব্যাক্তি বিনা পারিশ্রমিকে কবর খনন করে চলেছেন তিনি। মানুষের মৃত্যুর পর তার শেষ ঠিকানা নিশ্চিত করতে নীরবে-নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে চলেছেন। কোন পারিশ্রমিক নয়, নয় কোন স্বীকৃতির প্রত্যাশাও। শুধুমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় প্রায় ৪০ বছর ধরে কবর খনন করে চলেছেন তিনি। কারো মৃত্যুর খবর পেলেই তিনি কাঁধে একটি ব্যাগ ও হাতে কোদাল নিয়ে ছুঁটে যান। ব্যাগে থাকে কবর খননের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। দিন হোক কিংবা রাত। মানুষের শেষ যাত্রায় তিনি পাশে দাঁড়াতে সর্বদা প্রস্তুত। এ পর্যন্ত তিনি একাকী গত ৪০ বছরে ৩১০টি কবর খনন করেছেন। শুধু তাই নয়-যৌথভাবে আরও শতাধিক কবর খনন করেছেন। আশ্চর্যের বিষয়-এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কবর খনন বাবদ কারো নিকট থেকে কোন ধরনের পারিশ্রমিক গ্রহণ করেননি।
মোঃ আব্দুল কাফি (৫৮) দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের নশরতপুর গ্রামের মৃত আহাদ আলীর ছেলে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ৪ ছেলে ও ৩ কন্যা সন্তানের জনক। তাঁর চাচাও এভাবে কবর খনন করতেন। জীবিকার জন্য তিনি বিভিন্ন এলাকায় ফেরি করে সূঁই-সুতা ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বিক্রি করেন। এছাড়াও অবসর সময়ে তিনি মাছ স্বীকার করেন। সাধারণভাবে জীবনযাপন করলেও মানুষের জন্য এক অসাধারণ সেবার নজির গড়ে তুলেছেন তিনি। আব্দুল কাফির বিশ্বাস-মানুষের শেষ ঠিকানা তৈরি এ কাজই তাঁর জন্য পরকালের পাথেয় হতে পারে। তাই তিনি কোন প্রতিদানের আশা না করে কবর খননের কাজ করে চলেছেন একাগ্রতার সঙ্গে। শুধু নিজ এলাকায় নয়-তিনি দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল জেলায়ও কবর খনন করেছেন। কবর খননের দীর্ঘ জীবনে অনেক ঘটনাই তিনি দেখেছেন। তবে একবার একটি কবর খননের সময় পড়নের কাপড়সহ প্রায় অক্ষত অবস্থায় একটি মরদেহ দেখতে পাওয়ার ঘটনা আজও তাঁকে নাড়া দেয়। মানুষের ব্যস্ত এ পৃথিবীতে যখন স্বার্থের হিসেবেই বড় হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই মোঃ আব্দুল কাফির মতো মানুষের মনে করিয়ে দেয় নিঃস্বার্থ মানবসেবা হতে পারে জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয়।
স্থানীয় মাদরাসা শিক্ষক ও সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম, সাংবাদিক মৃত্যুঞ্জয় সরকার, ঈমাম মৌলানা আনোয়ার হোসেন, ভ্যানচালক ছাবের আলী বাতাস, আতিয়ার রহমানসহ অনেকেই জানান, কবর খননের বিনিময়ে শুধু টাকা নয়, এক কাপ চা ও পান পর্যন্ত গ্রহণ করেন না তিনি। এমনকি তিনি মৃত ব্যক্তির দো'আ অনুষ্ঠানে দাওয়াত দিলেও তা গ্রহণ করেন না। তাঁর এই নিঃস্বার্থ কাজ এলাকায় তাঁকে বিশেষ সম্মানের আসনে বসিয়েছে।
এ ব্যাপারে আব্দুল কাফির কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মনের টানে এ কাজ করি। কারো মৃত্যুর খবর পেলে বাড়িতে থাকতে পারিনা। যতক্ষণ কবরস্থানে বা মৃত ব্যাক্তির বাড়িতে পৌঁছাতে পারিনা, ততক্ষণ ছটফট লাগে। কবর খনন করে কারো কোন কিছু বিনিময় গ্রহন করিনা। সকলের কাছে সন্তানসহ পরিবারের জন্য শুধু দোয়া চাই।