একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ২৯ জুন, ২০২৬, ১১:২৫ এএম
একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই

দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি অঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। নিউমোনিয়া ও বার্ধক্যজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

পরিবার ও হাসপাতাল সূত্র জানায়, গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়া হয়। কয়েক দিন আগে ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেওয়ায় কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও পরে আবারও অবস্থার অবনতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

শিল্পীর স্ত্রী মেরী মনোয়ার এর আগে জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন ছিলেন। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তিনি প্রোস্টেট ক্যানসারসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যানসারের চিকিৎসার জন্যও হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল তাঁকে। পরে ভারতের দিল্লিতে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছিলেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের ছেলে সাদাত মনোয়ার জানিয়েছেন, সোমবার মরদেহ বাসায় রাখা হবে। মঙ্গলবার (৩০ জুন) জানাজার পর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ জাতীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। পরে বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরা জেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান।

ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকা ও সংগীতের প্রতি ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণও করেন। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম নকশাকার ছিলেন তিনি। কর্মজীবনের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (বিএফডিসি) এবং বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে জীবনের প্রথম পাপেট শো আয়োজন করেন মুস্তাফা মনোয়ার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে নতুন মাত্রায় জনপ্রিয় করে তোলার পেছনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। এ কারণেই তিনি 'বাংলাদেশের পাপেটম্যান' হিসেবে পরিচিতি পান।

শিশু-কিশোরদের জন্য নির্মিত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান 'নতুন কুঁড়ি', 'মনের কথা' এবং 'মীনা' প্রকল্পের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তাঁকে নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে পরিচিত করে তোলে। পাশাপাশি 'পারুল' চরিত্রের স্রষ্টা হিসেবেও তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন।

শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। পরে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে 'সুলতান স্বর্ণপদক' প্রদান করে।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন একজন বহুমাত্রিক শিল্পী, শিক্ষক, নির্মাতা ও সংগঠককে হারাল। তাঁর সৃষ্টিকর্ম, শিল্পভাবনা এবং শিশুদের জন্য নির্মিত অসংখ্য উদ্যোগ আগামী প্রজন্মের কাছে দীর্ঘদিন অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে