মুরগি পালনে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন বুনছে জোবেদা, মাসে আয় অর্ধলাখ টাকা

এফএনএস (জালাল উদ্দিন; সাঁথিয়া, পাবনা) : | প্রকাশ: ২৯ জুন, ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
মুরগি পালনে ভাগ্য বদলের স্বপ্ন বুনছে জোবেদা, মাসে আয় অর্ধলাখ টাকা

জীবন যে কত কঠিন তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন জোবেদা খাতুন। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার সেনগাঁতী গ্রামের বাসিন্দা জোবেদা খাতুন,সংসারে স্বামী ও ছেলে-মেয়েদেরকে নিয়ে যখন দিশেহারা তখন খুঁজে পান নিজেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ।এরই মধ্যে পরিচয় হয় সিরাজগঞ্জের উল-াপাড়ার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা প্রোগ্রামস ফর পিপলস ডেভেলপমেন্ট(পিপিডি)সংস্থার স্পেশাল প্রোগ্রাম-ডেভেলপমেন্ট(এগ্রিকালচার)এর সংশ্ল্লিষ্ট কর্মকর্তার সাথে।তিনি তাকে উল্লাপাড়ায় সেনগাঁতী পশ্চিমপাড়া মহিলা সমিতিতে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন এবং পরবর্তীতে তিনি সমিতিতে ভর্তি হন। এরপর মুরগি পালনের জন্য সংস্থা থেকে ক্ষুদ্র পরিসরে ঋণও গ্রহণ করেন। সংস্থা তাকে পরামর্শ দেন কুপ মডেল পদ্ধতির মাধ্যমে দেশি মুরগি পালন করার জন্য।

কারণ তিনি আগে থেকেই সনাতন পদ্ধতিতে দেশি মুরগি পালন করতেন। প্রথম অবস্থায় তাকে দুই দিনের প্রশিক্ষণ এবং সেই সঙ্গে ১০০ টি দেশি মুরগির বাচ্চাসহ অন্যান্য উপকরণ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়। সেখান থেকে শুরু হয় জোবেদা খাতুনের ঘুরে দাঁড়ানো ও সামনে পথচলা। বর্তমানে নিজের মুরগির খামার থেকে এখন তিনি বানিজ্যিকভাবে ডিম ও মুরগি বাজারে বিক্রি করে সংসারে স্বচ্ছলতার পাশাপাশি দুই ছেলে ও এক মেয়েদেরও বিয়ে দিয়েছেন।

কুপ মডেল বা মাচা পদ্ধতিতে ফ্লোরসিস্টেম ও খামারের চারপাশে মুরগি দিনের বেলা ঘুরে বেড়ানোর জন্য নেট দিয়ে একটি জায়গা তৈরি করা হয়।ফলে মুরগিগুলো নিরাপদে বিচরণ করতে পারে কোনো ক্ষতিকর প্রাণির(শিয়াল,বেজি, চিল,বিড়াল)আক্রমণ ছাড়াই। অন্যদিকে নেটের বেড়ার জন্য মুরগিগুলো বাইরের অন্য পাখির সংস্পর্শে আসেনা, এতে খামারের জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে।প্রদর্শনীর ডিজাইন অনুসারে জোবেদা খামারে কিছু সবজিও চাষ করছেন মুরগির চড়ে বেড়ানোর জায়গায়। মুরগিগুলো সবজি খাওয়ার কারণে তার বাইরের খাদ্য খরচ খুব কম হচ্ছে তিনি জানান।

কথা হয় জীবন সংগ্রামে হার না মানা জোবেদার সঙ্গে তিনি বলেন,স্বামীর রোজগারের পাশাপাশি বর্তমানে তিনিও সংসারের খরচের অংশীদারিত্ব রাখছেন।এই উন্নতির পেছনে পিপিডি সংস্থার উদ্যোগ ছিলো,যা আর্থিক ও কারিগরিভাবে সহায়তা করেন পল্ল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন(পিকেএসএফ)। বর্তমানে তার খামারে মুরগির সংখ্যা প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ টি। প্রতিদিন তিনি ডিম ও মুরগি বিক্রি করেন এবং প্রতিমাসে তার খরচ বাদে আয় হয় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। অনেক সময় লোকাল পাইকার এসে খামার থেকেই মুরগি ও ডিম নিয়ে যায়। দেশি মুরগি পালন করে শুধু স্বাবলম্বী নয় অত্র এলাকায় ভালো নারী উদ্যোক্তা হিসাবে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। অনেকে জোবেদা খাতুনের উন্নত পদ্ধতিতে মুরগি পালনে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমিতির অন্যান্য সদস্যরা স্বল্প পুঁজিতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব খামার।

জোবেদার সফলতা দেখে উল্লাপাড়া উপজেলার সেনগাঁতী গ্রামের খামারী খাদিজা খাতুন, চর সাতবাড়ীয়া গ্রামের রাবেয়া খাতুন,সনা খাতুন, লায়লী খাতুন, এনায়েতপুর গ্রামের মুক্তি খাতুন, আখি খাতুনসহ অনেক নারী দেশি মুরগির কুপ মডেল পদ্ধতিতে নতুন নতুন খামার স্থাপন করেছেন। ফলে নারীদের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলেন, জোবেদার খামার দেখে আমরা এই পদ্ধতিতে দেশি মুরগি পালন করে এখন স্বাবলম্বী হয়েছি।

পিপিডি সংস্থার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. রাসেল বলেন, কুপ মডেল পদ্ধতিতে স্বল্প পুঁজিতে দেশি মুরগি পালন করা যায়।এতে বাড়তি কোন ঝামেলাও নেই। বাড়ির বাইরে ছেড়ে দিলে শাক-সবজি, ঘাস, লতা-পাতা, ক্ষুদ্র পোকা-মাকড় খেয়ে বেঁচে থাকে। এই মুরগির তুলনামূলক রোগবালইও কম হয়। খাঁচায় থাকায় বাচ্চাগুলো নিবিড় পরিচর্যায় থাকে।সময়মতো ২টি রাণীক্ষেত,২টি গামবোরো ও ১টি ফাউল কলেরা রোগের টিকা নিশ্চিত করলে রোগবালাইজনিত মৃত্যুহার রোধ করা সম্ভব হয়।ফলে ৯০ থেকে ১০০% বাচ্চা ডিম বা মাংস দেওয়ার উপযোগী সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

উল্লাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলেছেন, কুপ মডেল পদ্ধতির খামার সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে পারলে একদিকে নিরাপদ মাংস মিলবে,অন্যদিকে নতুন নতুন নারী উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং বেকার সমস্যার সমাধান হবে। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বলেন,খামারিরা যেন তাদের ব্যবসা প্রসারে বে-সরকারি সংস্থা থেকে স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা পায় সে জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

পিপিডি সংস্থার সহকারি পরিচালক (এ্যাডমিন ও প্রজেক্ট) ও ফোকাল পার্সন মো. মামুনুর রহমান জানান, জোবেদা খাতুন ছাড়াও আরও ১৭টি অসহায় পরিবার যথা ৩টি উপজেলায়(বেড়া,শাহজাদপুর ও উল্ল-াপাড়া)বিনামূল্যে প্রশিক্ষণসহ দেশি মুরগি লালন-পালন করে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরে এনেছেন উক্ত কার্যক্রমের মাধ্যমে। সোনালী, ব্রয়লার,লেয়ার,বাউ চিকেনসহ অন্যান্য মুরগি পালন করলেও দেশি মুরগির অনেক চাহিদা রয়েছে বাজারে। সে কারণে দেশি মুরগি পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে