ভালুকায় অল্প বেতনে মিলছে শিশু শ্রমিক। যে বয়সে শিশুরা বই কলম হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়া কথা সেই হাত দিয়ে অনেকে কঠিন পরিশ্রম ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত হচ্ছেন। শিশু শ্রম নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে আইন ও প্রচার থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিষ্টানে শিশু শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে। শিশু শ্রমিকদের ক্ষেত্রে কাজের ধরন ও কর্মঘণ্টা সংক্রান্ত আইনের বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না । অনেক কম পারিশ্রমিক দিয়ে খাটানোর সুযোগ থাকায় প্রতিষ্ঠানের মালিকরা শিশুশ্রমিক নিয়োগ করছেন।
জানাযায়,বিদ্যমান আইনে (শ্রম আইন, ২০০৬) বলা হয়েছে, কোনো পেশায় বা প্রতিষ্ঠানে কোনো শিশুকে নিয়োগ করা বা কাজ করতে দেওয়া যাবে না। তবে সক্ষমতা থাকা সাপেক্ষে কোনো কিশোরকে তার পিতা-মাতার অনুমতিতে কাজে নিযুক্ত করা যাবে। কিন্তু দিনে ৫ থেকে ৭ ঘণ্টার বেশি কাজ করানো যাবে না। ভালুকায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন হোটেল রেস্তোরা,ওয়ার্কসপ,বেকারী,বফর কারখান,মৎস্য খামার,মাছের আরত,কাচাঁ বাজার এমনকি অনেক পোষাক কারখানায় শিশু শ্রমিক দিয়ে দিনে ১২ ঘন্টা থেকে ১৫ ঘন্টা কাজ করিয়ে থাকে প্রতিষ্ঠানের মালিকরা।
ভালুকা উপজেলার কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, শিশু-কিশোরকে নগণ্য পারিশ্রমিক দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে দেখা গেছে। কর্মরত শিশু শ্রমিকদের গড় বয়স ১০ থেকে ১৫ বছর। অভাবের তাড়নায় কোমল মতি হাতগুলো ধরেছে ঝাড়ু, তেলকালিমাখা যন্ত্রপাতি কিংবা লোহা কাটার ভারী যন্ত্র।
উপজেলার সিডস্টোর বাজারে মক্কা ডেন্টিং ও পেন্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কসবে কাজ করেছে ১৪ বছরের কিশোর চেং মারমা। তার বাড়ী খাগরাছড়ি জেলার উকিয়া। কথা বলার সময় তাকে বেশ ক্লান্ত মনে হয়েছিল। তার শরীর ধুলো ময়লায় চেহারা ফেকাসে ছিল। সে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ডেন্টিং ও রংয়ের কাজ করে। শিক্ষা নবীস হিসাবে তাকে মাসে কোন টাকা দেয়া হয় না। সংসারের অভাব অনটন থাকায় বাড়ী থেকে এখানে চলে আসছে। কাজ শিখা শেষ হলে দোকান মালিক তাকে মাসিক বেতন দিবেন। উপজেলার ভাওয়ালিয়াবাজু গ্রামের সুজনের ছেলে ১১ বছর বয়সী সুমন। জীবনের ঝুকি নিয়ে ইঞ্জিন চালিত ভ্যান দিয়ে ভারী মামলা পরিবহন করতে দেখা গেছে। প্রতিদিন ভ্যানে মালামাল পরিবহন করে থাকে। কঠোর পরিশ্রমে শরীর একেবারে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ভ্যান গাড়ীর জমা মিটিয়ে সে প্রতিদিন ৩ থেকে ৫শত টাকা আয় করে। তার পড়া লেখা করার ইচ্ছে রয়েছে। কিন্তু সংসারের অভাব অনটনের জন্য তারা বাবা মা কাজে পাঠায়। পৌর সদরে সেভেন স্টার নামে রেস্তোরায় কথা হয় উপজেলার ভাওয়ারমোড় গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইমরানের সাথে। সে মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতো। তার মামা ৪ হাজার টাকা বেতনে হোটেলের কাজে পাঠায়। সকাল ৭ টায় কাজে আসে রাত ৮টা পর্যন্ত কাজ করে। তার পরনে মলিন পেন্ট,গায়ে ময়লাযুক্ত গেঞ্জি, মাথায় নেট মোড়ানো কাজ করতে করতে হাত ভিজে সেত সেতে হয়ে গেছে। ওই হোটেলেই বয়ের কাজ করে আরেক এক শিশু বাড়ী উপজেলা ত্রিশাল পোড়াবাড়ী গ্রামের শাহজাহানের ছেলে পারভেজ বয়স ১৪ বছর। সে জানায় তারা তিন ভাই সে স্কুলে পড়তো। অভাবের সংসারে হোটেলে বয়ের কাজ নিয়েছে। তাকে মাসিক ৯ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয়। থালাবাসন ধোয়া, ঝাড়ু দেওয়া, খাবার পরিবেশনসহ সব ধরনের কাজই তাকে করতে হয়। হাকিম নামের এক শিশু শ্রমিকের সঙ্গে কথা হয় বয়স ১৩ বছর। তার পড়ালেখা করতে ইচ্ছে হয়। সংসারে অভাবের তাড়নায় তার মা তাকে ত্রি হুইলার গাড়ীর হেলপারের কাজে পাঠিয়েছেন। সে দিনে ১২ ঘণ্টা কাজ করে। সে দিনে সে একশত পঞ্চাশ থেকে আয় করে। তাতেই সে খুশী। তবে সে তার ভবিষৎ নিয়ে চিন্তিত। নাম গোপন রাখার শর্তে একজন পূর্ণবয়স্ক রেস্তোরার কর্মী জানান একই কাজে পুর্নবয়স্ক কর্মীকে মাসে ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকা দেয়া হয়। মালিক তার লাভের জন্য শিশু শ্রমিক নিয়োগ দিয়ে থাকেন। এছাড়াও উপজেলার অধিকাংশ রেস্তোরায় অল্প বেতনে শিশু শ্রমিক দিয়ে কাজ করাচ্ছেন হোটেল মালিকরা।
আসপাডা এনজিও প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আব্দুর রশিদ জানান, ভালুকায় দারিদ্র্যের দোহাই দিয়ে শিশু শ্রমকে বৈধতা দেওয়ার প্রবণতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হারে বেড়ে গেছে। আমাদের এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে,যেখানে একটি শিশুকে এক মিনিটের জন্য যেন শ্রমিকের কাজ করতে না হয়। আমার এনজিও আসপাডা শুরু থেকে হত দরিদ্র শিশুদের নিয়ে কাজ করছে। দরিদ্র পরিবারকে স্বাবলন্বি করার জন্য অর্থ সহায়তা ও তাদের সন্তানদের বিনা টাকায় লেখাপড়া করার জন্য স্কুল নির্মান করে দেয়া হয়েছে। মোট কথা দরিদ্র শিশু কিশোরদের পড়ালেখার পাশাপাশি কর্ম মুখী শিক্ষা দিতে হবে। স্থানীয় পুজিঁবাদরাই অল্প বেতনে দরিদ্র শিশুদেরকে কাজ করার জন্য বেছে নেয়। ভালুকা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ফিরোজ হোসেন জানান, শিশু-কিশোরদের শ্রমিক হিসেবে কাজের সুযোগ কোনোভাবেই থাকতে দেওয়া উচিত নয়। আমরা কিছু উদ্যোগ নিচ্ছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো, সব খাতেই শিশুশ্রম সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করা হবে। অভারের তাড়নায় সংসারে সামান্য সাহায্য করার জন্য অনেক দরিদ্র শিশুরাই অল্প বেতনে শ্রমিক হিসাবে কাজ করে। ভালুকায় পোষাক কারখানাসহ প্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো শিশু শ্রমমুক্ত হলেও আর্থসামাজিক পরিস্থিতির কারণে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতগুলো এখনো মুক্ত হতে পারেনি।