২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জাতীয় সংসদে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। চলতি অর্থবছরের তুলনায় বাজেটের আকার প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। এতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং মূল্যস্ফীতি কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির প্রাক্কলন করা হয়েছে, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। অর্থমন্ত্রী বাজেটকে মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলার একটি সমন্বিত রূপরেখা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন এবং ‘থ্রিআর কৌশল’ ঘোষণা করেছেন, যার মাধ্যমে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বাজেটে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে রাজস্ব ঘাটতি, কর আদায়ে দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে এই লক্ষ্য অর্জন কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং কিছু ক্ষেত্রে করছাড়ের সংশোধনী সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তি বয়ে আনলেও বিনিয়োগের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। আমাদের মতে, বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে দেখা গেছে, বড় বাজেট প্রণয়ন হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্বল তদারকি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উন্নয়ন প্রকল্পে সময়ক্ষেপণ, ব্যয় বৃদ্ধি এবং দুর্নীতি বাজেটের লক্ষ্য পূরণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। তাই এবার বাজেট বাস্তবায়নে কঠোর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, বাজেটের মানবিক দিক। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সংস্কার, কর ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। বাজেটের ঘাটতি পূরণে ঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনসম্পৃক্ততা একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের প্রত্যাশা, বাজেটের ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কাগজে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার লক্ষ্য অর্জনই হবে বাজেটের প্রকৃত সাফল্য।