বরিশালকে এক সময় শান্ত জনপদ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সম্প্রতি উদ্বেগজনকভাবে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, দস্যুতা ও নানাধরনের সহিংস অপরাধের ঘটনায় দিন দিন বাড়ছে জনমনে আতঙ্ক। অপরাধ দমনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান তৎপরতার ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রপ্তোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা আরো বেড়ে যাচ্ছে।
বরিশাল জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ২ জুলাই পর্যন্ত জেলার দশ থানা এলাকায় ৪০টি হত্যাকান্ড, আটটি ডাকাতি, সাতটি দস্যুতা, ১১০টি ধর্ষণ, ১৪২টি চুরি ও ১৪৯টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এসব পরিসংখ্যানই জেলার অপরাধ পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। শুধু সংখ্যাই নয়; বরং সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকান্ডের নৃশংসতা পুরো জেলাজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট বাশাইল গ্রামের পহেলা জুলাই দিবাগত রাতে জহিরুল শিকদার (৩৯) নামের এক যুবককে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরধরে নিহত জহিরুল ওই গ্রামের আব্দুর রশিদ শিকদারের ছেলে। এ ঘটনায় ২ জুলাই থানায় হত্যা মামলা দায়েরের পর পুলিশ এজাহারভূক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে।
সূত্রমতে, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল সদর উপজেলার রায়পাশা-কড়াপুর ইউনিয়নের বৌসেরহাট বাজার এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বিএনপিকর্মী দেলোয়ার হোসেন চৌধুরীকে (৫০) কুপিয়ে হত্যা করা হয়। কু-প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ১৫ মার্চ বাবুগঞ্জে মাত্র নয় বছর বয়সের শিশু রাইসাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধে ৩১ মে মুলাদী উপজেলার দড়িচর লক্ষ্ণীপুর গ্রামে আনোয়ার হোসেন ঢালীকে (৫৫) পিটিয়ে হত্যা করা হয়। গত বছরের ১৯ জুন উজিরপুর পৌর এলাকার ভিআইপি রোডে নিজ বাড়িতে আলেয়া বেগম (৬০) নামের এক বিধবা নারীকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। এই নির্মম ঘটনায় নারী নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। ওই বছরের ২৭ জুলাই উজিরপুর উপজেলার বরাকোঠা ইউনিয়নের খাটিয়ালপাড়া গ্রামে মাদকাসক্ত ছেলের ছুরিকাঘাতে নিহত হন বাবা শাহ আলম খান (৬২)। একই বছরের ১৭ নভেম্বর বাবুগঞ্জ উপজেলার আগরপুর স্টিল ব্রিজ এলাকায় রাজনৈতিক বিরোধের জেরে সংঘর্ষে ছাত্রদল নেতা রবিউল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
সূত্রে আরও জানা গেছে, হত্যা ছাড়াও ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতার মতো অপরাধের ঘটনাও বরিশালে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে ১১০টি ধর্ষণের ঘটনা নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। বরিশালের পুলিশ সুপার এ.জেড.এম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমি বরিশালে যোগ দিয়েছি তিন মাস হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আমরা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং এখনো করছি। বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের জিরো টলারেন্স অব্যাহত রয়েছে। বিচ্ছিন্ন যে অপরাধের ঘটনাগুলো ঘটছে এগুলোর অধিকাংশই জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে। বরিশাল জেলা পুলিশ আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সবসময় তৎপর রয়েছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর বরিশাল মহানগর কমিটির সম্পাদক মো. রফিকুল আলম বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের নিয়মিত টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। অপরাধীরা যদি দ্রুত আইনের আওতায় এসে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়, তাহলে অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে। একইসাথে সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ জোরদার করাও প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনে শুধু অভিযান চালালেই হবে না; অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ, মাদক নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক সহিংসতা কমানো এবং বিচার প্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো প্রয়োজন। অন্যথায় বরিশালে অপরাধের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতে আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
বরিশাল আদালতের অতিরিক্ত স্পেশাল পিপি অ্যাডভোকেট এস.এম সরোয়ার হোসেন বলেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। হত্যা, ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত নিরপেক্ষ ও দ্রুত শেষ করে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে অপরাধীরা উৎসাহিত হওয়ার সুযোগ পায়। তাই তদন্ত সংস্থা, প্রসিকিউশন ও বিচার বিভাগকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে অপরাধীরা দ্রুত আইনের আওতায় এসে শাস্তি পায় এবং সমাজে আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা আরো সুদৃঢ় হয়।