রাজশাহী অঞ্চলে চলতি বর্ষা মৌসুমে তুলনামূলক বৃষ্টি কম হওয়ায় ভরা আষাঢ়ে চৈত্রের মতো খরা দেখা দিয়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও খরার কারণে ফসলের মাঠ শুকিয়ে যাচ্ছে। আমন ধান রোপণের মৌসুমের মাঝা মাঝি এসেও বীজতলা প্রস্তুত করতে ব্যাহত হচ্ছে। যাদের বীজতলা প্রস্তুত প্রচন্ড খরার কারণে তারাও বীজতলা থেকে বীজ তুলে জমিতে আমন ধান রোপণ করতে পারছে না। এতে বৃষ্টি নির্ভর আমণ চাষ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় প্রায় ৮৩ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে রোপা আমন চাষ ও উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১৭ হাজার ৪৯০ মেট্রিক টন। গত অর্থবছরে চাষ হয়েছিল ৮৩ হাজার ৫৫০ হেক্টর। সঠিক সময়ে রোপণ কাজ সম্পন্ন করা গেলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রায় কোন প্রভাব পড়বে না দাবি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের।
রাজশাহীতে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। পাশাপাশি নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বৃষ্টিপাত কমার ফলে দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট আরও গভীর হচ্ছে। মাঝ আষাঢ়েও কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা নেই রাজশাহীতে। তাতে শুষ্ক বরেন্দ্র এখনও ধুলোয়-ধূসর আমন চাষের মাঠ-ঘাট। বৃষ্টি না হওয়ায় চাষিরা অতিরিক্ত খরচে বীজতলা করেছেন সেচের পানিতে। তাই আমনের আবাদে কৃষকের অপেক্ষা বৃষ্টির পানির, নয়তো বাড়বে উৎপাদন খরচ। তবে, এ অবস্থায় মাঠ পর্যায়ে কৃষি যন্ত্রাংশ ও পানি পেতে নানা সহায়তায় কাজ করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
রাজশাহী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে গেল মাসে মাত্র ৬দিনে বৃষ্টি হয়েছে ৫২ দশমিক ৮ মিলিমিটার। তবে গত দুই তিন ধরে সামান্য বৃষ্টি হচ্ছে তা দিয়ে ধান রোপণ করা সম্ভব না। এর মাঝে সেচের পানিতে তৈরি করা বীজতলা গুলো টিকিয়ে রাখতে সার, কীটনাশক দিয়ে যত বাড়িয়েছেন চাষিরা, তাতে বাড়ছে খরচ। গোদাগাড়ী নিমঘুটু গ্রামের কৃষক দুরবিন টুডু বলেন, আমাদের এলাকাতে বৃষ্টি কম। একটি মাত্র পাইপ থেকে পানি আসছে। খরচ বেড়ে যাবে। যেহেতু আমরা পানি পাচ্ছি না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ভরা বর্ষায়, জুনের শেষ থেকে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে প্রস্তুত হয় আমনের বীজতলা। তবে বৃষ্টি স্বল্পতায় এবারে বীজতলা করতে হয়েছে সেচের পানিতে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহেও বৃষ্টির দেখা না পেলে অতিরিক্ত খরচেই ধান লাগানোর আয়োজন করতে হবে বলছে কৃষক।
বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা জানান, তারা বৃষ্টির অপেক্ষায় আছেন। এখন যে খরচ লাগবে বৃষ্টি না হলে তার থেকে খরচ আরও বেড়ে যাবে বলে জানান তারা।তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, কৃষকদের কৃষি সরঞ্জাম ও সেচের পানি পাওয়া নিশ্চিত করে সহায়তা করছেন তারা। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই আমনের আবাদে মাঠ প্রস্তুত করতে পারবেন বলেও আশা করেছে কৃষি বিভাগ।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘ক্লিনার ওয়াটার’-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কম বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতার কারণে ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট অব্যাহত থাকতে পারে। এক্সট্রিম ক্লাইমেট অ্যান্ড হাইড্রোক্লাইমেট মডেলিং অব ওয়াটার স্ট্রিচ : ভমপ্লেকিশন ফর লাইভহুডস ইন রাজশাহী, বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একদল গবেষক। গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র, আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, ভূগর্ভস্থ পানির উপাত্ত এবং রাজশাহীর ১৩ উপজেলার ৩৮৫ পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে গড় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষকদের মতে বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষভাগে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কয়েক দফা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। ২০৮৮ সালের মধ্যে তা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও আছে। এ ছাড়া বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার দিনের সংখ্যা ২০১৮ সালের ১৩ দিন থেকে বেড়ে ২০৭৮ সালে প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গবেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে রাজশাহীর পানির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং খরাসহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন। গবেষকদের মতে পানিনির্ভর ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হলে রাজশাহীর ক্রমবর্ধমান পানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন বলেন, সামনে রোপা মৌসুম রয়েছে সেই রোপা মৌসুমে আমাদের বীজতলা করতে কোনো সমস্যা হবে না। কোনো সমস্যা হলে আমাদের যে সেচ যন্ত্র আছে তার সহায়তা দেওয়া হবে।