কমে যাচ্ছে চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ জৌলুশ

এফএনএস (মিজানুর রহমান; চাঁদপুর) : | প্রকাশ: ৭ জুলাই, ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
কমে যাচ্ছে চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে ইলিশ জৌলুশ

চাঁদপুর শহরের পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়া নদীর মিলনস্থলের কাছাকাছিতে অবস্থিত বড়স্টেশন মাছঘাট।এটি এখন চাঁদপুর মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র। একারণে চাঁদপুরকে 'ইলিশের বাড়ি' বা 'ইলিশের রাজধানী' হিসেবে অভিহিত করা হয়। বিশাল পরিমাণে সুস্বাদু রুপালি ইলিশের উৎপাদন, আমদানি ও সরবরাহে দেশের বৃহত্তম ইলিশের মোকাম থাকার কারণে 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর' হিসেবে জেলাটির ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে 'ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর'। 

এখানে দিন দিন ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে দাম এখনো বেশ চড়া। ইলিশ মৌসুমে ইলিশের জৌলুশ যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।চাঁদপুর মাছঘাটের  ইলিশের সেই চাকচিক্য নেই বললেই চলে। এখন আর আগের মত ঘাটে দেখা যায় না সমূদ্রের একাধিক ফিশিং বোট।

স্থানীয় জেলেদের ধরা এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি কেজি ২ হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। ফলে অনেকেই দরদাম করেও ইলিশ না কিনে ফিরে যাচ্ছেন।

এদিকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশের আমদানি পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের মতে, আমদানি বাড়লে বাজারে ইলিশের দাম আরও কমবে।

তবে মৎস্য বিভাগের দাবি, ইলিশের আমদানি কমেনি; বরং বর্তমানে গড়ে মাছের আকার তুলনামূলক ছোট হওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুরে শহরের বড় স্টেশন মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

কিছু সময় ঘাটে অবস্থান করে দেখা গেছে, এখন আর আগের মত সড়ক ও নৌপথে হাতিয়া লক্ষীপুরসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশের আমদানি নেই। শুধুমাত্র স্থানীয় পদ্মা-মেঘনায় আহরিত ছোট বড় মিলিয়ে কিছু  ইলিশ আসছে আড়তে। তাও সংখ্যায় খুবই কম। নোয়াখালীর লক্ষ্ণীপুরের ব্যাপারীরা ঝুড়ি ভর্তি ইলিশ ঘাটে নিয়ে আসলে আড়তে তোলা মাত্র ভিড় জমে যায় পাইকারদের। সেখানে দেখা যায়, ইলিশের চেয়ে পাইকারের সংখ্যা বেশি। 

চাঁদপুর সদর আখনের হাট এলাকার  জেলে মজনু সরকার বলেন, এখন ইলিশের মওসুম, কিন্তু নদীতে পর্যাপ্ত পানি বা স্রোত নেই।সারাদিন জাল বেয়ে জ্বালানি খরচও ঠিক মতন উঠছে না, মাছ খুবই কম পাওয়া যাচ্ছে। 

হরিনা রাঢ়ি বাড়ি এলাকার জেলে ছলেমান বলেন, এখন বর্ষা মৌসুম শুরু হয়েছে। অন্য বছর ইলিশের আমদানি কিছুটা বেশি ছিল। তবে এবার কমেছে। বড় সাইজের ইলিশ কম। টেম্পু ইলিশ বেশি পাওয়া যাচ্ছে।

ইলিশের বাজারদর জানালেন চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছঘাটের ইলিশ বিক্রেতা ইমরান। তিনি বলেন, ইলিশের সঙ্গে মঙ্গলবার (৭ জুলাই, ২০২৬) মাঝারি সাইজের ১০-১২ টি নদীর পাঙ্গাশ মাছ ঘাটে বিক্রির জন্য জেলেরা নিয়ে এসেছে। তবে চাহিদা অনুযায়ী ইলিশের আমদানি খুবই কম। আড়তে ইলিশ না থাকায় গত দুইদিন যাবত মাছ কিনে বিক্রি করতে পারছেন না। ইলিশের দাম শুনে ক্রেতারা চলে যাচ্ছে। 

গত বছরের তুলনায় ইলিশের দাম কেজিপ্রতি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির নেতা সুমন খান জানান,সাগর ও নদীর উপকূলীয় অঞ্চলের আহরিত ইলিশের উপর নির্ভরশীল চাঁদপুর মাঝঘাট। সাগরের ইলিশ আমদানি কম হওয়ায় এখানে ইলিশের তেমন প্রাচুর্যতা এবার দেখা যাচ্ছে না। সামনের জোঁতে বুঝা যাবে ইলিশের আমদানি কেমন হয়।  

শহরের অদূরে মহামায়া থেকে আসা মহসিন নামে এক ক্রেতা বলেন, আত্মীয়র বাড়িতে মাছ পাঠাতে মাছঘাটে এসেছেন ইলিশ কেনার জন্য। ঘাটেই ইলিশের এত দাম শুনে অবাক! 

দাম দেখে চলে যেতে হয়। কারণ ১ কেজি ইলিশের দাম দিয়ে ৩ কেজির বেশি গরুর মাংস পাওয়া যায়। চাঁদপুরে থেকেও ইলিশের স্বাদ নিতে পারি না।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি লিমিটেড-এর সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত সরকার বলেন, আষাঢ় মাসে ইলিশের আমদানি খুবই কম। জ্যৈষ্ঠ মাসে প্রতিদিন ১ থেকে দেড়শ’ মণ ইলিশ আমদানি হলেও চলতি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ২০ মণও হয়না ইলিশের আমদানি। 

তিনি বলেন, ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। ৭০০ থেকে ৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ৪০০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রতিকেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। তবে আমদানি বাড়লে দাম কমবে।

চাঁদপুর সদরের জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, ইলিশের আমদানি সংখ্যায় কমেনি। জেলেদের জালে যেসব ইলিশ ধরা পড়ছে, তাতে গড় ইলিশের ওজন ও আকার ছোট। এই কারণে উৎপাদনের পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেতে পারে। তবে অনেক বেশি নয়।

তিনি আরও বলেন, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষা করায় ইলিশের উৎপাদন গত কয়েক বছরে বেড়েছে। আরও বাড়বে যদি নদীর প্রবাহ ঠিক থাকে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, নদীতে ডুবুচর, ইলিশের খাবার সংকটসহ নানা কারণে এখন পদ্মা-মেঘনায় ইলিশের বিচরণ কম।

ইলিশ আমদানি কম হওয়ার কারণ সম্পর্কে জানালেন ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান। তিনি বলেন, প্রাকৃতিক ও মানুষের সৃষ্ট কারণে ইলিশের বিচরণ কমেছে। প্রাকৃতিক কারণে নদীর পানিতে লবণের মাত্রা বেড়েছে। জেলের সংখ্যা আগের চেয়ে বেশি। মাছ ধরার কাজে নতুন নতুন প্রযুক্তি ও ফাঁদ ব্যবহার হচ্ছে। যেমন-খুবই সূক্ষ্ম কারেন্ট জাল ও চায়না দুয়ারি জাল।

চাঁদপুর ইলিশ অবতরণ কেন্দ্রে এখন মাছের চেয়ে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের ভিড়  বেশি। নদীতে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা না পড়ায় ঘাটে সরবরাহ অনেক কম। এর ফলে স্থানীয় বাজারে ১ কেজি ওজনের ইলিশ আড়াই হাজার টাকার ওপরে  পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।

ইলিশের ভরা মৌসুম চললেও চাঁদপুরের প্রধান মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে (বড় স্টেশন মাছঘাট) আশানুরূপ ইলিশ আসছে না। ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, গত কয়েক বছর ধরেই এখানে ইলিশের যোগান কমেছে। দক্ষিণাঞ্চল থেকে যেসব মাছ আসছে, তার আকারও তুলনামূলক ছোট।

দাম ও ক্রেতাদের অবস্থা সরবরাহ সংকটের কারণে পাইকারি ও খুচরা-উভয় বাজারে ইলিশের দাম আকাশচুম্বী। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর গভীরতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়া অবৈধ জালের ব্যবহার এবং জেলেদের জালে বড় মাছ কম ধরা পড়াও সংকটের অন্যতম কারণ।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে