চট্টগ্রামের শিল্পসমৃদ্ধ জনপদ সীতাকুণ্ডের সমকালীন রাজনৈতিক ইতিহাসে যেসব ব্যক্তিত্ব দীর্ঘ সময় ধরে জনআলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন, তাঁদের অন্যতম অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ। শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য, শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা, দীর্ঘ সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, বহু বছরের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দীর্ঘ কারাবাস, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় এবং পরবর্তী বিচারাধীন আইনি প্রক্রিয়া, সব মিলিয়ে তিনি উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য নাম।
দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি সীতাকুণ্ড। জাহাজ পুনর্ব্যবহার শিল্প, ইস্পাত ও সিমেন্ট কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র এবং সমুদ্রবন্দরসংলগ্ন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই জনপদের রাজনৈতিক গুরুত্বও সবসময়ই জাতীয় পর্যায়ে বিশেষভাবে বিবেচিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে এখানকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে শিল্প ও ব্যবসা খাতে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। একই সময়ে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উত্তর জেলা বিএনপির সফল আহ্ববায়ক হিসেবে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন এবং পরবর্তীতে দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দলীয় নেতাদের মতে, সাংগঠনিক দক্ষতা, কর্মীদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনীতির কারণে তিনি উত্তর চট্টগ্রামে একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
২০১৬ সালের পর তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং তিনি দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। সমর্থকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই সময় পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। কারামুক্তির পর তিনি প্রচলিত ব্যাংকিং বিধি অনুসরণ করে ঋণ পুনঃতফসিলের মাধ্যমে ব্যবসা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেন এবং পুনরায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন।
নির্বাচন কমিশন তাঁর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করার পর ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসন থেকে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। পরে তাঁর প্রার্থিতা ও শপথগ্রহণসংক্রান্ত বিষয় বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। এ বিষয়ে তাঁর সমর্থকেরা আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আইনগত প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকার কথা জানিয়েছেন।
উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডা. কমল কদর বলেন, অধ্যাপক আসলাম চৌধুরী এফসিএ 'র শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, শিল্পোদ্যোক্তা হিসেবে অভিজ্ঞতা এবং সাংগঠনিক নেতৃত্ব তাঁকে চট্টগ্রামের মানুষের কাছে একজন জনপ্রিয় নেতায় পরিণত করেছে। তাছাড়াও লায়ন আসলাম চৌধুরীর এফসিএ বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের কাছে একজন জনপ্রিয় নেতা হিসেবে সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।
পৌরসভা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোজাহির উদ্দিন আশরাফ বলেন, অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন শুধু নির্বাচনী রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের বিভিন্ন সময়ে তিনি কর্মীদের পাশে থেকেছেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘ কারাবাসের পর মুক্তির দিনে নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি তাঁদের নেতার প্রতি ভালোবাসা ও আস্থার বহিঃপ্রকাশ ছিল।
রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা, সমাজসেবা, শিল্পোন্নয়ন এবং বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততার কথা স্থানীয়ভাবে প্রায়ই আলোচিত হয়। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং উন্নয়নমূলক উদ্যোগে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি স্থানীয় জনগণ ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেন।
স্থানীয় বিভিন্ন ইউনিয়ন, বাজার ও শিল্পাঞ্চলে কথা বলে জানা যায়, অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। একদিকে তাঁর সমর্থকেরা দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সাংগঠনিক নেতৃত্ব এবং জনসম্পৃক্ততার কথা তুলে ধরেন; অন্যদিকে অনেকে মনে করেন, চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির পরই তাঁর রাজনৈতিক অধ্যায়ের পূর্ণ মূল্যায়ন সম্ভব হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাজনৈতিক নেতার অবস্থান কেবল একটি নির্বাচন বা একটি সময়ের সাফল্য দিয়ে নির্ধারিত হয় না। দীর্ঘ সময়ের জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক দক্ষতা, নেতৃত্ব, জনআস্থা এবং সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার মধ্য দিয়েই ইতিহাস একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়ন করে। এই বাস্তবতায় অধ্যাপক আসলাম চৌধুরীকে ঘিরে সীতাকুণ্ডের রাজনৈতিক আলোচনা এখনও অব্যাহত রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, শিক্ষা ও পেশাগত পরিচয়, শিল্পোন্নয়নে সম্পৃক্ততা এবং সমর্থকদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা তাঁকে উত্তর চট্টগ্রামের সমকালীন রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ওপর নির্ভরশীল হলেও স্থানীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ পথচলা নিঃসন্দেহে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।