কুয়াকাটা ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের গভীর-অগভীর উপকূলে ইলিশসহ বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক মাছ আহরণক্ষেত্র এখন সাধারণ জেলেদের হাতছাড়া হয়ে গেছে। এর নিয়ন্ত্রণ এখন “আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ দখলে চলে গেছে। ফলে শত বছর ধরে সাধারণ জেলেদের জীবন-জীবিকার ক্ষেত্র সামুদ্রিক মাছ আহরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয় মাছের আহরণক্ষেত্র মাছশূণ্য হয়ে পড়েছে। গত তিন-চার বছরে এই আহরণক্ষেত্রে টলিং বোটের সুক্ষ্ণ ফাঁসের নেটিংএর কারণে মাছের পোনা থেকে শুরু করে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রসহ মাছের বংশ পর্যন্ত ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ফলে কৃষির পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলে পেশার মানুষ চরম সংকটে পড়েছেন। তাঁদের পেশা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপকূলের অর্ধলক্ষাধিক জেলেসহ এই পেশা সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৪০ হাজার পরিবারে শুরু হয়েছে এক ভয়াবহ সংকটকাল। এসব পেশার মানুষ এখন মৎস্য সম্পদ রক্ষা, আর্টিসানাল ট্রলিং বোট বন্ধসহ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছে। তারা মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন করেছেন। করছেন বিক্ষোভ সমাবেশ। দিয়েছেন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে স্মারকলিপি। তারা মৎস্য সম্পদ বিধ্বংসী আর্টিসানাল ট্রলিং বোট বন্ধ করে মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার দ্রুত পদক্ষেপ দেওয়ার দাবি করেছেন।
জেলেরা বলে আসছেন, সরকারি নিষেধাজ্ঞা ও প্রচলিত আইনকে উপেক্ষা করে পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা, মহিপুর, আলিপুর ও আশাখালী মৎস্যবন্দর-সংলগ্ন বঙ্গোপসাগরে অবাধে চলছে অবৈধ ও রূপান্তরিত ‘আর্টিসানাল ট্রলিং বোটের’ দৌরাত্ম্য। সব চলছে ফ্রি-স্টাইলে। নিষিদ্ধ অতি ক্ষুদ্র ফাঁসের জাল এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রলিংবোটের মাধ্যমে নির্বিচারে মাছের পোনা, রেণু, ডিমওয়ালা মা মাছ, কাঁকড়ার বাচ্চা ও চিংড়ির পোনা নিধন করা হচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যবস্থা ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদনে। ফলে পেশার সংকটে পড়েছেন কলাপাড়া উপকূলীয় অঞ্চলের হাজার হাজার প্রান্তিক জেলে। পেশা সংশ্লিষ্ট আড়তদার, ট্রলারমালিক, শ্রমিক, বরফকল মালিক-শ্রমিকসহ প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রায় ৮০ হাজার পরিবারের ভয়াবহ সংকটকাল চলছে।
কলাপাড়া ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী জেলে সমিতির সভাপতি রফিকুল ইসলাম মৃধা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গভীর সমুদ্রে অবৈধ ট্রলিংয়ের কারণে মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হচ্ছে। বেহুন্দি জালসহ বিভিন্ন নিষিদ্ধ জালের ব্যবহারে বিপুল পরিমাণ পোনা ও ডিমওয়ালা মাছ নিধন হওয়ায় সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। তারা দাবি করেন এভাবে মাছের সংকটে এ পেশায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত অন্তত ৮০ হাজার পরিবার বর্তমানে চরম বিাপকে পড়েছে। পরিকল্পিতভাবে দেশের মৎস্য সম্পদ এভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে।
কামাল মাঝি অভিযোগ করেন, আধুনিক ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস ও অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে কিছু প্রভাবশালী ট্রলিং বোট সমুদ্রে নির্বিচারে মাছ শিকার করছে। ফলে সাধারণ জেলেরা দিনের পর দিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না। এতে তাদের আয় বন্ধের পথে। পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।
জেলেরা জানান, মাছের সংকটের কারণে বহু জেলে এনজিও ও বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত আয় না থাকায় সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারছেন না। অনেক জেলে ইতোমধ্যে পেশা পরিবর্তন করে কাজের জন্য রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। খাদ্য, চিকিৎসা ও সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় বহন করাও অনেক পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
জেলেদের নেতারা বলেন, “রাক্ষুসে ট্রলিং বোটের কারণে সাধারণ জেলেরা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে উপকূলীয় মৎস্যখাত ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়বে।” তারা তাদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে চরম হতাশা প্রকাশ করেন এবং জীবিকা রক্ষায় সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন। তারা অবৈধ ট্রলিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গভীর সমুদ্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, নিষিদ্ধ জাল জব্দ, দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
জানা গেছে, কলাপাড়ার মহিপুর-আলিপুর এলাকায় গত বছর যেখানে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫টি রূপান্তরিত ট্রলিং বোট সক্রিয় ছিল। কিন্তু এ বছর বেড়ে প্রায় ৬০টিতে পৌঁছেছে। প্রতিনিয়ত সাধারণ কাঠের মাছধরা ট্রলারকে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে অবৈধভাবে ট্রলিং বোটে রূপান্তর করা হচ্ছে। দ্রুত অধিক মুনাফার আশায় এসব বোটে ফিশ ফাইন্ডার, জিপিএস, রাডার, ইকো সাউন্ডার ও উইঞ্চ মেশিনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, বিশাল আকৃতির এই ট্রলিং বোটগুলোর গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করার কথা। কিন্তু আইন অমান্য করে এগুলো উপকূলের মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। এসব বোটে ব্যবহৃত ভারী জাল বা ‘বটম ট্রলিং’ পদ্ধতি সমুদ্রের তলদেশের পরিবেশের জন্য চরম বিপজ্জনক। ভারী জাল সমুদ্রের তলদেশ ঘষে ঘষে টেনে নেয়। ফলে প্রবাল, সামুদ্রিক ঘাস, শামুক-ঝিনুকের আবাসস্থল এবং মাছের অভয়াশ্রম বা বাস্তুতন্ত্র পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
মহিপুর ও আলিপুর বন্দরের সাধারণ জেলেরা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা ছোট নৌকা ও ট্রলার নিয়ে যেখানে মাছ ধরেন, সেখানেই এই বড় ট্রলিং বোটগুলো এসে জাল ফেলে। প্রায়সময় বড় বোটগুলো ক্ষুদ্র জেলেদের জালের ওপর দিয়ে টেনে নেয়। এতে লাখ লাখ টাকার জাল ছিঁড়ে যায়। চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রান্তিক মৎস্যজীবীরা। ক্ষতিগ্রস্ত জেলেরা আরও জানান, এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গেলে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের পক্ষ থেকে জোটে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি। প্রায় এক বছর আগে কুয়াকাটা চৌরাস্তায় দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় জেলা থেকে আসা শত শত জেলে বিশাল মানববন্ধন করলেও প্রশাসনের তৎকালীন টুকটাক তৎপরতা দেখায়। এরপর আবার যেই সেই। নির্বিকার। মাঝি কাম ট্রলার মালিক আফজাল হাওলাদার জানান, মাছের সুষ্ঠু প্রজনন ও সংরক্ষণে সরকারের টানা ৫৮ দিনের নিষেধাজ্ঞার পওে অনেক আশা নিয়ে তারা সাগরে গিয়েছিলেন। কিন্তু সাগরে ইলিশ বা সামুদ্রিক মাছের দেখা পায়নি। প্রত্যেক ট্রলারে লাখ টাকার বেশি লোকসান হয়েছে। এর ওপর আবহাওয়া ভয়াবহ খারাপ হয়ে গেল। সাগর ভয়াল উত্তাল হওয়ায় ফের ঘাটে ফিওে এখন পর্যন্ত বসে বসে খাচ্ছেন।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষণের পাশাপাশি এই অবৈধ বোট ও জালের ব্যবহার সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। ডিমওয়ালা মা মাছ ও পোনা নিধনের ফলে মাছের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইলিশ, রূপচাঁদা, পোয়া, লাক্ষা, চিংড়িসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের উৎপাদন কমে গেছে। এতে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, রপ্তানি আয় এবং দীর্ঘমেয়াদে ‘ব্লু ইকোনমি’ বা নীল অর্থনীতির সম্ভাবনাও হুমকির মুখে পড়তে শুরু করেছে।
সাধারণ জেলেদের অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও নৌ-পুলিশের নীরবতার কারণে বছরের পর বছর এসব অবৈধ ট্রলার প্রকাশ্যে সাগরে মাছ শিকার করছে। মহিপুরের জেলে আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমরা সমুদ্রে গিয়ে মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে আসি। অথচ কিছু প্রভাবশালী মালিক অবৈধ ট্রলিংয়ের মাধ্যমে সাগরের সব মাছ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
জেলে আবুল কাশেম আক্ষেপ করে বলেন, ‘ছোট মাছ বড় হওয়ার আগেই ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। লাখ লাখ রেণু, পোনা প্রতিদিন নিধন হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের আর মাছ ধরার মতো কিছুই থাকবে না।’
মৎস্য ব্যবসায়ী ও পাইকার রুবেল মিয়া বলেন, ‘আগে যে পরিমাণ মাছ বিএফডিসি ঘাটে আসত, এখন তার চার ভাগের এক ভাগ মাছও উঠছে না।’ মহিপুর মৎস্য ব্যবসায়ী আড়ত মালিক সমিতির সহ-সভাপতি রাজু আহমেদ রাজা মিয়া আক্ষেপ করে বলেন, ‘অবৈধ ট্রলিং বন্ধের বহুবার আলোচনা হয়েছে, কিন্তু বন্ধ হয়নি। উল্টো বোটের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ফলে সাধারণ জেলেরা ক্ষতির মুখে পড়েছে। প্রশাসন উদ্যোগ না নিলে এসব বন্ধ করা সম্ভব হবে না।’
ফিশারিজ কর্মকর্তা বখতিয়ার আহমেদ বলেন, ‘অবৈধ জালের কারণে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা নিধন হচ্ছে। ফলে মাছের উৎপাদন কমে যাচ্ছে এবং মৎস্যসম্পদ হুমকির মুখে পড়ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য ও লাখো মানুষের জীবিকা রক্ষায় কঠোর আইন প্রয়োগ জরুরি।’ কুয়াকাটা নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মনিরুজ্জামান বলেন, ‘ট্রলিং বোট নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। আমরা সর্বদা তৎপর, তবে গভীর সমুদ্রে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’ পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ট্রলিং বোটের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। এই অবৈধ তৎপরতা সম্পূর্ণ নির্মূল করতে কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং জেলে প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অভিযান ও নজরদারি আরও জোরদার করা হবে।’ উপকূলের পরিবেশকর্মী ও সাধারণ জেলেদের মতে, এখনই যদি এই প্রভাবশালী ট্রলিং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তবে অদূর ভবিষ্যতে রূপালি ইলিশের আবাসস্থল উপকূলীয় বঙ্গোপসাগরের মাছের ভাণ্ডার ধ্বংস হয়ে যাবে।