খুলনায় পিতার হাতেই খুন হয় নির্জনা: মায়ের জবানবন্দি

এফএনএস (এম এ আজিম; খুলনা) : | প্রকাশ: ১১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
খুলনায় পিতার হাতেই খুন হয় নির্জনা: মায়ের জবানবন্দি

জন্মদাতা পিতার হাতেই খুনের শিকার হয়েছেন খুলনার সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৭)। কথার অবাধ্য হওয়ায় রাগের মাথায় নেশাগ্রস্ত পিতা আলীম হোসেন আকাশ মাথার পেছনে আঘাত করায় অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সে। এরপর চরম অস্থিরতার মধ্যে বস্তা বন্দী করে নিরালায় ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতক পিতা। 

নির্জনা হত্যার ঘটনায় মা সীমা আক্তার আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়ে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। একই ঘটনায় নিহতের বাবা মো. আলীম হোসেনকে আটকের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। শনিবার সকাল ১০টায় কেএমপির সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেন। 

তিনি বলেন, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় পুলিশ পরিচয় শনাক্ত ও হত্যার রহস্য উদঘাটনে তাৎক্ষণিকভাবে তদন্ত শুরু করে। পিবিআই, সিআইডিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থার সহায়তায় পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা চালানো হয়। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিকটিমের ছবি প্রচার, বেতার বার্তা প্রেরণ এবং বিভিন্ন মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। অজ্ঞাতনামা ভিকটিমের পরিচয় সনাক্ত করতে না পারায় থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে ১০ জুলাই  খুলনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তের ২৪ ঘন্টার ভিতর নিহতের পরিচয় আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) হিসেবে শনাক্ত হয়। তিনি সোনাডাঙ্গা থানাধীন বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং মোঃ আলিম হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সিমা দম্পতির কন্যা।

পরবর্তীতে খুলনা সদর থানা পুলিশ নিহতের বাসায় গিয়ে তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫)-কে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রদান করেন। পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে একপর্যায়ে স্বীকার করেন যে, তার মেয়ে বিভিন্ন ছেলেদের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে, যার ফলশ্রুতিতে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ সৃষ্টি হয়। উক্ত পারিবারিক কলহের কারণেই নিজ কন্যা আরফানা হোসেন নির্জনা এই হত্যাকান্ডের শিকার হন। হত্যার পর মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে খুলনা সদর থানাধীন প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডে ফেলে রেখে ঘটনাটি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করেন।ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটন করতঃ খুলনা সদর থানা পুলিশের একটি আভিযানিক টিম ৩৬ ঘন্টার মধ্যে ১০ জুলাই আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫)-কে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। পরবর্তীতে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় বিজ্ঞ আদালতে দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। এ ঘটনায় জড়িত অপর আসামি মোঃ আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে পুলিশের অভিযান ও তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো জানানো হয়, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মোঃ রেজাউর রহমান এর নেতৃত্বে একটি চৌকস আভিযানিক টিম অভিযান অব্যাহত রেখেছে। প্রেস ব্রিফিংয়ে আরো উপস্থিত ছিলেন মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, পিপিএম-সেবা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক অ্যান্ড প্রটোকল, অতিঃ দায়িত্বে এ্যাডমিন এন্ড ফিন্যান্স), এম, এম শাকিলুজ্জামান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (সদর দপ্তর, অতিঃ দায়িত্বে এফএন্ডবি) অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত এবং অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ক্রাইম এন্ড অপস্ (ভারপ্রাপ্ত), মোঃ রেজাউর রহমান, ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, অতিঃ ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ), মোঃ শফিকুল ইসলাম, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন), মোঃ শফিকুল ইসলাম অফিসার ইনচার্জ খুলনা থানা এবং খুলনাস্থ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দ। এর আগে শুক্রবার (১০ জুলাই) খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম নিহতের মা সীমা আক্তারের জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

সীমা জানান, অল্প বয়সে পরপর দুটি বিয়ে হওয়া এবং প্রায়ই কথার অবাধ্য হয়ে বাড়ির বাইরে থাকার কারণে মেয়ে নির্জনার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত ছিলেন তার নেশাগ্রস্ত পিতা আলিম হোসেন আকাশ। গত বুধবার সন্ধ্যার দিকে সোনাডাঙ্গা বসুপাড়ার বাসায় এই নিয়ে ফের পারিবারিক কলহ শুরু হলে রাগের মাথায় নির্জনার মাথার পেছনে সজোরে আঘাত করেন আকাশ। এতে মুহূর্তের মধ্যে অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে নির্জনা এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এর আগে, গত বুধবার (৮ জুলাই) রাত ১০টার দিকে খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন নিরালার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি সাততলা ভবনের সামনে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহটি খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মরদেহের ছবি দেখে হাসপাতালে গিয়ে মেয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন তার মা। নির্জনা নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানার বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। ঘটনার পর প্রথমে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নির্জনার বিয়ে হয় এবং তার স্বামী তাকে হত্যা করে থাকতে পারেন। তবে তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্যরাও পুলিশের তদন্তের আওতায় আসেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার করা আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাইয়ের অংশ হিসেবে মা-বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে