পূর্ব সুন্দরবনে চোরা শিকারির ফাঁদে আটকে পড়া মারাত্মক আহত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারটি দীর্ঘ ৬ মাসের চিকিৎসা শেষে আবার ফিরে যাচ্ছে তার আবাসস্থল সুন্দরবনে। ফাঁদে বন্দিদশা থেকে উদ্ধার হওয়া মারাত্মক আহত বাঘিনীটি বন বিভাগের প্রচেষ্টায় দীর্ঘ চিকিৎসায় এখন পুরোপুরি সুস্থ। প্রকৃতির প্রহরী সেই বাঘিনীকে আজ ১২ জুলাই রবিবার সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বনে ছেড়ে দেবে বন বিভাগ। এ সময় বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলামসহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথম সুন্দরবনের অসুস্থ বাঘকে সুস্থ করে আবার বনে অবমুক্ত করা হচ্ছে।
বন বিভাগ জানায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকির খালের অদূরে সুন্দরবনে শিকারিদের পেতে রাখা হরিণ ধরার ছিটকা ফাঁদে আটকে যায় বাঘিনীটি। খবর পেয়ে বন বিভাগের একটি বিশেষজ্ঞ দল ৪ জানুয়ারি গুরুতর আহত বাঘটিকে উদ্ধার করে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যায়। গুরুতর আহত বাঘটির চিকিৎসায় গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। সেখানেই চলে দীর্ঘ চিকিৎসা।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, সুন্দরবন থেকে উদ্ধারের সময় দেখা যায়, বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ে ৩ ইঞ্চির মতো জায়গায় চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষত হয়ে পচন ধরে গিয়েছিল। ছয় মাসের চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যায় বাঘিনীটি এখন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠেছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ বলেন, একটি বাঘ ১২-১৪ বছর বেঁচে থাকে। তাকে তার আপন পরিবেশ সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে ছেড়ে দেওয়ার পরে তার গতিবিধি দেখার জন্য বাঘিনীটির গলায় স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে ছাড়ার মতামত দিয়েছেন তিনি। ভারতের সুন্দরবন অংশে এমন ছয়টি বাঘকে স্যাটেলাইট কলার দেওয়া হয়েছে বলে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ এম এ আজিজ জানান।
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, সুস্থ হয়ে বাঘিনীটি আগের চেহারায় ফিরেছে। ৯ ফুট দৈর্ঘ্যরে বাঘিনীটির ওজন বেড়ে এখন ৯০ কেজি হয়েছে। তার ক্ষিপ্রতা বেড়েছে; সে এখন শিকার ধরে খেতে পারবে। সুন্দরবনে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বাঘিনীটির গলায় একটি কলার পরানোর কথা ছিল, কিন্তু নানা জটিলতায় সেটা বিদেশ থেকে আনা সম্ভব হয়নি। তবে বনে ছাড়ার পরে বাঘিনীটির নিরাপত্তা ও সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করতে এবং গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বনের ৮ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যে বিচরণ ক্ষেত্রের ২০টি পয়েন্টে অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরা ট্র্যাপ স্থাপন করা হচ্ছে। বাঘিনীকে সুন্দরবনে নিরাপদে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বাঘ বিশেষজ্ঞ, অভিজ্ঞ বন্যপ্রাণী চিকিৎসক ও বন কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে। তারা এক বছর ধরে অবমুক্তকরণ এলাকায় বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করবে। সুন্দরবনের বাঘ ছেড়ে দেওয়ার সময় বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীসহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন বলে সিএফ জানিয়েছেন।