একটি শিশুর হাসি একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। কিন্তু সেই হাসির আড়ালে যদি লুকিয়ে থাকে জন্মগত হৃদরোগ, তবে আনন্দের সঙ্গে ভর করে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ আর ব্যয়ের পাহাড়। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক পরিবার সন্তানের হৃদরোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেকেই আবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসার সুযোগ না পেয়ে নীরবে বয়ে বেড়ান অসুস্থতার যন্ত্রণা।
এবার উত্তরবঙ্গের এমন শিশুদের পাশে দাঁড়াতে রাজশাহীতে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে তিন দিনব্যাপী বিশেষ কর্মসূচি। ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল রাজশাহীর উদ্যোগে আগামী ২২ থেকে ২৪ জুলাই শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।
প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে এই বিশেষ কর্মসূচি। এতে চীনের খ্যাতিমান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) বিশেষজ্ঞরা যৌথভাবে চিকিৎসাসেবা দেবেন।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহীর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান।
উত্তরবঙ্গের শিশুদের জন্য বড় সুযোগ
এই কর্মসূচিতে ৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুদের জন্মগত হৃদরোগ শনাক্ত করা হবে। চীনের এর সাত সদস্যের বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজি দল এবং এনআইসিভিডির পরিচালকসহ আটজন পেডিয়াট্রিক কার্ডিওলজিস্টের সমন্বয়ে গঠিত চিকিৎসক দল এতে অংশ নেবেন।
শুধু রোগ শনাক্ত করেই থেমে থাকবেন না বিশেষজ্ঞরা। শিশুর হৃদরোগের তীব্রতা ও জটিলতা নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হবে। গুরুতর রোগীদের প্রয়োজনে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা অথবা আরও উন্নত চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে।
কর্মসূচিকে ঘিরে ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। ২১ জুলাই পর্যন্ত ২ হাজার ৮০০-এর বেশি শিশুর নিবন্ধন সম্পন্ন হয়েছে।
একটি হাসপাতাল, একটি মানবিক উদ্যোগ
১৯৮৪ সালে মরহুম ডা. আব্দুল খালেকের দান করা জমিতে প্রতিষ্ঠিত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহী দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছে। ২০২৪ সালের ২ নভেম্বর ১০০ শয্যার হৃদরোগ হাসপাতাল হিসেবে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে করোনারি এনজিওগ্রাম, স্টেন্টিং, পেসমেকার স্থাপন, পিটিএমসি, সার্বক্ষণিক জরুরি বিভাগ, আউটডোর, সিসিইউ, পিসিসিইউ, আইসিইউ, জেনারেল বেড ও কেবিনসহ আধুনিক চিকিৎসাসেবা চালু রয়েছে।
তবে হাসপাতালটির কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হয়ে উঠেছে অসহায় ও অসচ্ছল রোগীদের পাশে দাঁড়ানো। কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালটি চালুর পর গত দেড় বছরে ভর্তি হওয়া অসহায় ও অসচ্ছল রোগীদের চিকিৎসা ব্যয়ে মোট ১ কোটি ৮৭ লাখ ৯৮ হাজার ৯০৮ টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সহায়তায় কমবে চিকিৎসার ব্যয়
শুধু বিশেষ ক্যাম্প নয়, দরিদ্র মানুষের জন্য নিয়মিত চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতেও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ওষুধ, ক্যাথল্যাব যন্ত্রপাতি, ডায়াগনস্টিক ল্যাব রিএজেন্ট ও মেডিকেল ইকুইপমেন্ট কেনার জন্য হাসপাতালটি সরকারি বরাদ্দ হিসেবে পেয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ টাকা।
এর মধ্যে প্রায় ৪১ লাখ টাকার ওষুধ হাসপাতালে ভর্তি দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে দেওয়া হবে। নতুন ক্যাথল্যাব যন্ত্রপাতির মাধ্যমে অন্তত ১০০ জন গরিব রোগী ৫০ শতাংশ ছাড়ে এবং ৫০ জন দরিদ্র রোগী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এনজিওগ্রামের সুযোগ পাবেন।
এ ছাড়া নতুন ল্যাব রিএজেন্ট ব্যবহারের ফলে হৃদরোগসংক্রান্ত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যয়বহুল পরীক্ষার ফি ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব হবে।
আরও বড় স্বপ্ন দেখছে ফাউন্ডেশন
ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. আব্দুল মান্নান মনে করেন, হৃদরোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরকারি বরাদ্দ ১০ কোটি টাকায় উন্নীত করা গেলে আরও বেশি দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষ সরাসরি বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে তাদের চিকিৎসা ব্যয় কমার পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তাও নিশ্চিত হবে।
বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের জন্য স্বল্প ব্যয়ে উন্নত হৃদরোগ চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহী কাজ করে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
রাজশাহীতে আয়োজিত এই বিশেষ ক্যাম্প তাই কেবল একটি চিকিৎসা কর্মসূচি নয়; উত্তরবঙ্গের হাজারো পরিবারের জন্য এটি নতুন আশার দরজা খুলে দিতে পারে। কোনো শিশুর ছোট্ট হৃদয় যদি জন্মগত ত্রুটিতে দুর্বল হয়ে থাকে, সময়মতো শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা তার জীবনকে ফিরিয়ে দিতে পারে স্বাভাবিক ছন্দে। আর সেই সুযোগটিই এবার বিনামূল্যে পৌঁছে যাচ্ছে রাজশাহীর মাটিতে।
সংবাদ সম্মেলনে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন রাজশাহীর সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মিজানুর রহমান খোকন, সহসভাপতি হাসান আলী, পরিচালক ও চিফ কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. রইস উদ্দিন মণ্ডল, পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) অধ্যাপক হবিবুর রহমান, যুগ্ম সম্পাদক মো. লিয়াকত আলী, নির্বাহী সদস্য ডা. ওয়াসিম হোসেন, এনামুল হক এবং প্রচার ও জনসংযোগ সম্পাদক ইমতিয়াজ আহমেদ শামসুল হুদাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।