সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়ার সুখবর মিলেছে। বন বিভাগের সর্বশেষ ক্যামেরা ট্র্যাপিং জরিপে ২০২৪ সালে সুন্দরবনে ১২৫টি বাঘের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে। আগের জরিপে এই সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালের জরিপে বাঘের সংখ্যা ১১৪টিতে দাঁড়িয়েছিল। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১৯টি বেড়েছে। তবে বাঘের সংখ্যা বাড়লেও চোরা শিকার, হরিণ শিকার, আবাসস্থল সংকোচন ও মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ নিয়ে উদ্বেগ রয়ে গেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২ দশমিক ১৭টি বাঘ রয়েছে। ২০২৪ সালের জরিপে ৬৫৭টি ক্যামেরা ফাঁদের মাধ্যমে বাঘের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এর আগে ২০১৮ সালের জরিপে পাওয়া গিয়েছিল ১১৪টি বাঘ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে বাঘের বিচরণও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বন কর্মকর্তারা। পর্যটকদের পাশাপাশি বন বিভাগের বিভিন্ন কার্যালয়ের ক্যামেরাতেও বিভিন্ন বাঘের ছবি ধরা পড়ছে। বন কর্মকর্তাদের মতে, বনে বাঘের প্রধান খাবার চিত্রা হরিণ ও বন্য শূকরের পর্যাপ্ত উপস্থিতি থাকায় বাঘের বিচরণক্ষেত্রও বেড়েছে।
২০২৫ সালের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে চিত্রা হরিণের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৪টি এবং বন্য শূকর রয়েছে ৪৭ হাজার ৫১৫টি। বাঘের খাবারের প্রায় ৭৮ শতাংশ আসে চিত্রা হরিণ থেকে, ১১ শতাংশ বন্য শূকর এবং বাকি ১১ শতাংশ অন্যান্য উৎস থেকে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ডিএফও নির্মল কুমার রায় বলেন, ইদানীং পর্যটকরা বাঘ দেখতে পাচ্ছেন। বন বিভাগের বিভিন্ন অফিসের ক্যামেরাতেও ভিন্ন ভিন্ন বাঘের ছবি মিলছে। তাঁর মতে, এটি বাঘের সংখ্যা বাড়ার সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।
বাঘের সংখ্যা বাড়লেও নিরাপত্তার বিষয়টি পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। সুন্দরবন সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়কারী মো. নুর আলম শেখের দাবি, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে বিভিন্ন কারণে ৯১টি বাঘ মারা গেছে। এর মধ্যে ৫৮টি শিকারিদের হাতে বা গণপিটুনিতে মারা হয়েছে। বার্ধক্য ও অসুস্থতায় ৩০টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে তিনটি বাঘের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানান।
তবে বন বিভাগের হিসাবের সঙ্গে এই তথ্যের পার্থক্য রয়েছে। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগে ৬২টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুষ্কৃতকারীদের হাতে ২৬টি, গণপিটুনিতে ১৪টি এবং স্বাভাবিক কারণে ২১টি বাঘ মারা গেছে। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছ্বাসে মারা যায় একটি বাঘ।
বন বিভাগের হিসাবে, ২০২৩ সালে সুন্দরবনে সর্বশেষ একটি বাঘের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নতুন করে কোনো বাঘের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। কর্মকর্তারা বলছেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত টহল এবং বাঘ সংরক্ষণে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করা বাংলাদেশ ন্যাচার অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ প্রোটেকশন সেন্টারের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ বনি বলেন, “বাঘ সুন্দরবনের সৌন্দর্য। বাঘ আছে বলেই এখনও বন অনেকটা সুরক্ষিত।”
তাঁর মতে, অতীতে চোরা শিকারিরা বাঘ হত্যা করে চামড়া ও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিক্রি করত। সুযোগ পেলেই সংঘবদ্ধ চক্রটি আবারও বাঘ হত্যায় তৎপর হতে পারে। তাই বাঘ রক্ষায় চোরা শিকারিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বন বিভাগের তৎপরতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বাঘের আবাসস্থল ও খাবারের নিরাপত্তার ওপরও জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও গবেষক ড. সামিউল হক বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক পুরুষ বাঘের জন্য ৬০ থেকে ১৫০ বর্গকিলোমিটার এবং স্ত্রী বাঘের জন্য ২০ থেকে ৬০ বর্গকিলোমিটার বিচরণক্ষেত্র প্রয়োজন। পর্যাপ্ত খাবার থাকলে তুলনামূলক ছোট এলাকাতেও বাঘ টিকে থাকতে পারে।
তিনি বাঘ সংরক্ষণে হরিণ শিকার পুরোপুরি বন্ধ, চোরা শিকারিদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং শিকার ও পাচারবিরোধী আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে ক্যামেরা ট্র্যাপ ও রেডিও কলারের মাধ্যমে নিয়মিত বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও ডিসিপ্লিন বিভাগের অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ হারুন সুন্দরবনে মানুষের অনিয়ন্ত্রিত প্রবেশ ও বাঘের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাঘের জন্য নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা জরুরি। আবাসস্থল সংকুচিত হলে বাঘের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজননও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
বাঘের খাবারের অন্যতম প্রধান উৎস হরিণ রক্ষায়ও জোর দেওয়া হচ্ছে। পূর্ব সুন্দরবনের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানিয়েছেন, হরিণ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১৩৫ জন হরিণ পাচারকারীর তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
সুন্দরবনে মানুষের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণেও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ। বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের দুই বিভাগে ৭৪ কিলোমিটার এলাকায় নাইলনের দড়ি দিয়ে ফেন্সিং করা হয়েছে। বাঘ যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে এবং ঢুকে পড়লেও মানুষের হাতে প্রাণ না হারায়, সে জন্য বনসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিয়ে স্থানীয় কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
সুন্দরবনের দুই বিভাগে চারটি রেঞ্জ কার্যালয়, ১১টি স্টেশন ও ৬১টি টহল ফাঁড়ি রয়েছে। বনরক্ষীরা নিয়মিত টহলের পাশাপাশি স্মার্ট পেট্রোলিং টিমের মাধ্যমে বন্যপ্রাণীর নিরাপত্তা নজরদারি করছে।
বাঘ সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবে আহত একটি বাঘের চিকিৎসা শেষে আবার সুন্দরবনে অবমুক্ত করার ঘটনাও রয়েছে। শিকারিদের ফাঁদে আহত বাঘটিকে ছয় মাস চিকিৎসা দেওয়ার পর সম্প্রতি বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় হরিণ পাচারবিরোধী অভিযানসহ বিভিন্ন কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে।
সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টিতে পৌঁছানো নিঃসন্দেহে সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য আশাব্যঞ্জক খবর। তবে এই সাফল্য ধরে রাখতে হলে বাঘের খাবার, নিরাপদ আবাসস্থল এবং চোরা শিকার বন্ধে নজরদারি অব্যাহত রাখার বিকল্প নেই। বাঘের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি তাদের নিরাপদে টিকে থাকার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।