ফরাসি ইলেকট্রনিক সংগীতশিল্পী ও ডিজে কাভিনস্কি নামে পরিচিত ভিনসেন্ট বেলোরজেকে প্যারিসের নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৯ জুলাই) সন্ধ্যায় তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) ফরাসি প্রসিকিউটররা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত শুরু হয়েছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধারকারীরা সন্দেহজনক কোনো আলামত পাননি বলে জানিয়েছে প্রসিকিউটর কার্যালয়।
কাভিনস্কির আসল নাম ভিনসেন্ট বেলোরজে। শুক্রবার (৩১ জুলাই) তাঁর ৫১ বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল। তবে তার আগেই ৫০ বছর বয়সে থেমে গেল তাঁর জীবন। মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। প্যারিসের প্রসিকিউটররা জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
কাভিনস্কির মৃত্যুতে ফ্রান্সের সংস্কৃতিমন্ত্রী ক্যাথরিন পেগার শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, কাভিনস্কির আকস্মিক মৃত্যুতে ফ্রান্স একজন ব্যতিক্রমী শিল্পীকে হারিয়েছে। তাঁর সংগীত একদিকে নাচের আবহ তৈরি করত, অন্যদিকে পুরোনো স্মৃতি ও আবেগ জাগিয়ে তুলত। তাঁর গান প্রজন্ম ও দেশের সীমানা পেরিয়ে মানুষের মনে বেঁচে থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফরাসি ইলেকট্রনিক সংগীতের দৃশ্যে কাভিনস্কির পরিচিতি তৈরি হয় ২০০০-এর দশকের শুরুতে। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে তিনি ডাফট পাঙ্কের সঙ্গে মঞ্চে পারফর্ম করেন। ইলেকট্রনিক সংগীতের আরও কয়েকজন শিল্পীর সঙ্গেও কাজ করেন তিনি।
তবে বিশ্বজুড়ে কাভিনস্কির পরিচিতির সবচেয়ে বড় কারণ ‘নাইটকল’। ২০১০ সালে প্রকাশিত এই সিন্থওয়েভ গানটি তাঁর ক্যারিয়ারে বড় সাফল্য এনে দেয়। গানটি ডাফট পাঙ্কের সদস্য গি-ম্যানুয়েল দে ওমিস্তো এবং কাভিনস্কির সহযোগিতায় তৈরি হয়েছিল।
২০১১ সালে হলিউড নির্মাতা নিকোলা উইন্ডিং রেফনের সিনেমা ‘ড্রাইভ’-এ ‘নাইটকল’ ব্যবহৃত হলে গানটি নতুন করে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে যায়। সিনেমাটির প্রধান চরিত্রে ছিলেন রায়ান গসলিং। এরপর কাভিনস্কির সংগীত বিশ্বজুড়ে আরও পরিচিতি পায়। গানটি পরে লন্ডন গ্রামার, চাইল্ডিশ গ্যাম্বিনো ও ফিনিক্সসহ বিভিন্ন শিল্পী ও ব্যান্ডের পরিবেশনা ও সংগীতেও ব্যবহৃত হয়েছে।
২০২৪ সালে প্যারিস অলিম্পিকের সমাপনী অনুষ্ঠানেও ‘নাইটকল’ পরিবেশন করেন কাভিনস্কি। ফিনিক্স ও বেলজিয়ান পপশিল্পী অ্যাঞ্জেলের সঙ্গে তিনি গানটি পরিবেশন করেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও তাঁর মৃত্যুতে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাখোঁ কাভিনস্কিকে ‘চিরকাল ফ্রান্সের গর্বের উৎস’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
কাভিনস্কির সংগীতের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ১৯৮০-এর দশকের সিনেমা, ভিডিও গেম ও ইলেকট্রনিক সাউন্ডের প্রভাব। সংগীতের পাশাপাশি নিজের জন্য একটি কাল্পনিক চরিত্রও তৈরি করেছিলেন তিনি। সেই চরিত্রের নামই ছিল কাভিনস্কি।
২০০৭ সালের এক সাক্ষাৎকারে বেলোরজে জানিয়েছিলেন, নিজের অ্যালবামের প্রচ্ছদে শুধু নিজের ছবি ব্যবহার করতে তাঁর ভালো লাগত না। তাই তিনি কাভিনস্কি নামের একটি কল্পিত চরিত্র তৈরি করেন। তাঁর তৈরি গল্পে এই চরিত্রটি একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যায়। পরে নীল চামড়া ও লাল চোখ নিয়ে জীবিত মৃত এক ডিজে হিসেবে ফিরে আসে।
পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম ‘OutRun’-এ এই চরিত্রের গল্প আরও বিস্তৃতভাবে উঠে আসে। সেখানে কাভিনস্কিকে ১৯৮০-এর দশকের এক কিশোর হিসেবে দেখানো হয়, যে একটি লাল ফেরারি গাড়ি দুর্ঘটনায় ধ্বংস হওয়ার পর বহু বছর পর জীবিত মৃত অবস্থায় ফিরে আসে এবং ইলেকট্রনিক সংগীত তৈরির মিশনে নামে।
বেলোরজে বলেছিলেন, কাভিনস্কি তাঁর নিজেরই তৈরি একটি চরিত্র, তবে সেই চরিত্রের মধ্যে তাঁর নিজের চাওয়া-পাওয়ার কিছু প্রতিফলন ছিল। নিজের মুখের বদলে এই কল্পিত চরিত্রের মাধ্যমে সংগীত ও গল্প তুলে ধরতেই তিনি বেশি আগ্রহী ছিলেন।
২০০৩ সালে এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া পুরোনো ম্যাকিনটোশ কম্পিউটার দিয়েই সংগীত তৈরির শুরু তাঁর। ভিডিও গেমের প্রতি আগ্রহ থেকেই কম্পিউটারে সংগীত তৈরির দিকে ঝুঁকে পড়েন তিনি। পরে ২০০০-এর দশকজুড়ে সিন্থনির্ভর ইলেকট্রো-পপ সংগীত তৈরি করেন এবং ১৯৮০-এর দশকের সিনেমা ও ভিডিও গেম থেকে অনুপ্রেরণা নেন।
‘নাইটকল’-এর আকস্মিক সাফল্যের পর নিজের পরবর্তী সংগীত নিয়ে চাপ অনুভব করার কথাও জানিয়েছিলেন কাভিনস্কি। দীর্ঘ বিরতির পর ২০২২ সালে প্রকাশ করেন দ্বিতীয় ও শেষ স্টুডিও অ্যালবাম ‘Reborn’। তবে ‘নাইটকল’-এর মতো সাফল্য আর ফিরে আসেনি।
পরবর্তী সময়ে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘নাইটকল’-এর হঠাৎ সাফল্যের পর কিছু সময় তিনি আর রেকর্ড করতে চাননি। সেই সাফল্যের পর নিজের পরবর্তী সংগীত কেমন হবে, তা নিয়ে ভয় ও চাপ কাজ করছিল তাঁর মধ্যে। দীর্ঘ বিরতি তাঁকে নতুন করে ভাবার সুযোগ দিয়েছিল এবং পরে এককভাবে ও অন্য শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে আবারও সংগীত তৈরির আনন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন।
কাভিনস্কির সংগীতের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ১৯৮০-এর দশকের নস্টালজিয়া, সিনেমার আবহ এবং কাল্পনিক চরিত্রের গল্প তাঁকে ইলেকট্রনিক সংগীতের জগতে আলাদা পরিচিতি দিয়েছিল। ‘ড্রাইভ’ থেকে প্যারিস অলিম্পিকের মঞ্চ, ‘নাইটকল’ তাঁর সংগীতজীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় পরিচয় হয়ে ছিল। তাঁর মৃত্যুর কারণ জানতে তদন্ত চলছে।