তানোরে চেয়ারম্যানরাই কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার

মো: ইমরান হোসাইন; তানোর, রাজশাহী | প্রকাশ: ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০১ পিএম
তানোরে চেয়ারম্যানরাই কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার
রাজশাহীর তানোরে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরাই উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দের কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার বলে অভিযোগ উঠেছে। এ তহবিল বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা কোটেশনের নামে চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তছরুপ করছেন বলে একাধিক সুত্র নিশ্চিত করেছেন। তারা নানা কায়দা কৌশলে ও সচিবদের মাধ্যমে লাইসেন্স সংগ্রহ করে কাগজে কলমে কোটেশন দেখিয়ে নিম্নমানের কাজ করে আসছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত অর্থ বছরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দ দেয়া হয় দুই কিস্তিতে। এসব বরাদ্দের কাজ করতে হয় কোটেশনে বা টেন্ডারে। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তাদের একান্ত মেম্বাররা এসব বরাদ্দের কাজ নিজেরাই করছেন। কিন্তু চেয়ারম্যানরা কোনভাবেই এসব বরাদ্দের বিষয় বুঝতে দেয় না কাউকে। চেয়ারম্যানরা নিজেদের পছন্দের কিছু লাইন্সেস সংগ্রহ করে কাগজে কলমে কোটেশন দেখিয়ে ইচ্ছেমত নয়ছয় করছেন প্রকল্পের অর্থ। তিন লাখ টাকার কাজ এক লাখ থেকে দেড় লাখে করে বরাদ্দের টাকা তছরুপ করা হচ্ছে । একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দ দেয়া হয়। বরাদ্দ দেয়ার পর কাজ শুরুর আগে কাজের বিবরণ তুলে ধরে সাইনবোর্ড সাটানো প্রয়োজন। যাতে করে জনসাধারণ কাজের বিষয়ে অবগত হতে পারে। আবার কাজের তদারকি করে থাকেন স্থানীয় সরকার বিভাগ এলজিইডি ও ডিডিএলজি। কিন্তু এসব শুধু কাগজে কলমের নিয়ম মাত্র। চেয়ারম্যানরা যা করবেন সেটাই সঠিক। এসব বরাদ্দ অর্থ বছরের শুরুতে দেয়া হয়না। শুকনো মৌসুম পার হলে বর্ষা মৌসুমে দেয়া হয় বরাদ্দ। যার কারণে কাজও হয় নিম্নমানের। এক প্রকল্প একাধিক বার দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট জানা গেছে, উপজেলায় সাত ইউনিয়নে দুই দফায় বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রথম কিস্তির বরাদ্দ পাওয়ার পর কাজ শেষ হলে বা কাজের মাঝে দ্বিতীয় কিস্তির বরাদ্দ দেয়া হয়। গত অর্থ বছরের বরাদ্দ ছাড় হয়েছে চলতি অর্থ বছরে। বিভিন্ন ইউনিয়নে জুন ও তার পরেও কাজ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো উপজেলার সাত ইউনিয়নে ছয়জন আ.লীগ নেতারা চেয়ারম্যান ও একটিতে বিএনপি নেতা চেয়ারম্যান। কলমা ইউনিয়ন ইউপিতে জেলা আ.লীগের সহসভাপতি খাদেমুন নবী বাবু চৌধুরী, বাঁধাইড় ইউপিতে ইউনিয়ন আ.লীগের সভাপতি আতাউর রহমান। তিনি বিগত ২০১৬ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, পাঁচন্দর ইউপিতে ইউনিয়ন আ.লীগ সভাপতি আব্দুল মতিন। তিনি বিগত ২০১১ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তালন্দ ইউপিতে নাজিমুদ্দিন বাবু চেয়ারম্যান। তিনি ইউনিয়ন আ.লীগের সাবেক সভাপতি। কামারগাঁ ইউপিতে ২০২৪ সালের আগ থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সুফি কামাল মিন্টু। সরনজাই ইউপিতে চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হক খান। তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চাঁন্দুড়িয়া ইউপিতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিজানুর রহমান মেজর, সেও ইউনিয়ন আ.লীগ নেতা। বিগত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সবাই আত্মগোপনে ছিলেন এবং মামলার আসামীও আছেন কয়েকজন। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ইউপি সদস্যরা জানান, ইউনিয়ন পরিষদে উন্নয়ন সহায়তা তহবিল বরাদ্দের কোনকিছুই বুঝতে দেয়না চেয়ারম্যান ও সচিবরা। তারা ইচ্ছেমত প্রকল্প গ্রহণ করেন। দু’য়েকজন সদস্যরা জানতে পারলে তাদেরকে কিছু সুবিধা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়া হয়। সাত ইউনিয়নের মধ্যে চারটি বড় ইউনিয়ন পরিষদ। চার ইউনিয়নে বরাদ্দের পরিমানও বেশি। সেগুলো হল কলমা, কামারগাঁ, বাঁধাইড় ও পাঁচন্দর। তিনটি ছোট ইউনিয়ন পরিষদ। সেগুলো হল তালন্দ, সরনজাই ও চান্দুড়িয়া। তালন্দ ইউপির এক মেম্বার জানান, এই ইউপির চেয়ারম্যান লুটপাট ছাড়া কিছুই বুঝেনা। প্রায় দিন পরিষদে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাঝে এসব নিয়ে হট্টগোল লেগেই থাকে। তাকে এসব প্রকল্প নিয়ে বাজারে প্রকাশ্যে পিটিয়েছে। কিন্তু কোন লজ্জা বোধ নেই তার। অভিযোগ রয়েছে, নারী সদস্যদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন তিনি। কারণ নারী সদস্যরা কোন প্রতিবাদ করেনা। তাদের কে নামমাত্র সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকেন। অত্র ইউপির কালনা আদিবাসীপাড়া জেঠা টুডুর বাড়ির সামনের পুকুরে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ থেকে তিন লাখ টাকার প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করে চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। প্রকল্পের নাম জেঠার বাড়ি থেকে নরেশের বাড়ি পর্যন্ত প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ। বরাদ্দ ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা, অর্থ বছর ২০২৫-২৬, অর্থের উৎস উন্নয়ন সহায়তা তহবিল, দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার প্রস্থ ০.৬৫০ মিটার, সার্বিক সহযোগিতায় চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। বাস্তবায়নে, মেসার্স এআর কনস্ট্রাকশন বোয়ালিয়া রাজশাহী। স্থানীয়রা জানান, এপ্রটেকশন ওয়াল তিন নম্বর ইটের পরিমান বেশি ছিল। একেবারে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান নিজস্ব মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করিয়ে নিয়েছেন। ওয়াল নির্মাণে খুব বেশি হলে ১ লাখ টাকা খরচ হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে এভাবেই কাজ হয়েছে। কাজ ধরে সরেজমিনে তদন্ত করলেই ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়বে। চেয়ারম্যানরা জানান, কাজ শেষ করার পর কাজে ছবি পাঠাতে হয় ডিডিএলজিসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তরে। ফাঁকি দেয়ার কোন উপায় নেই। কাজ করেছেন আপনি তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম কেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, এভাবে কাজ হয়ে থাকে বলে এড়িয়ে যান। এব্যাপারে তানোর উপজেলা প্রকৌশলী নুরনাহার বলেন, এসব আমাদের দেখার বিষয় নয়। বরাদ্দ হয় উপজেলা নির্বাহীর দপ্তর থেকে। তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাঈমা খান (ইউএনও)’র সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নই। অনিয়ম হয়ে থাকলে গুরুত্বসহকারে দেখে ব্যবস্থা নেয়া হবে। 
আপনার জেলার সংবাদ পড়তে