দুবাইয়ে বেনজীরের জামিনে মুক্তির খবর, জানে না বাংলাদেশের পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ২ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম | প্রকাশ: ২ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:৩২ পিএম
দুবাইয়ে বেনজীরের জামিনে মুক্তির খবর, জানে না বাংলাদেশের পুলিশ
ছবি: সংগ্রহীত

দুবাইয়ে গ্রেপ্তার বাংলাদেশের পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ শর্তসাপেক্ষে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেলেও বিষয়টি সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য পায়নি বাংলাদেশের পুলিশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আদালত গত ২৭ জুলাই তার জামিন আবেদন মঞ্জুর করেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে ৩০ জুলাই তিনি কারামুক্ত হন বলে কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এদিকে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে দুবাইয়ে নিয়োগ করা ল’ ফার্মকে জামিন বাতিলের আইনি উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

রোববার (২ আগস্ট) ঢাকায় পুলিশ সদরদপ্তরের ইন্টারপোল শাখা ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) জানিয়েছে, বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই। এ বিষয়ে পুলিশ সদরদপ্তরের এআইজি এ এইচ এম শাহদাত হোসাইন সংবাদমাধ্যমে আসা খবরটি দেখেছেন বলে জানান। তিনি সংশ্লিষ্ট এনসিবি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পর জানতে পারেন, বেনজীরের মুক্তির বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

তবে একই দিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, বেনজীরের জামিন বাতিলের জন্য দুবাইয়ে নিয়োগ করা ল’ ফার্মকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীর সারদায় পুলিশ একাডেমির একটি অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বেনজীরের জামিনের খবর শোনার পর তিনি স্বরাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে কথা বলেছেন। পরে স্বরাষ্ট্র সচিব সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন আগেই শুধু এই মামলার জন্য দুবাইয়ে একটি ল’ ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে। ওই ফার্মকে বেনজীরের জামিন বাতিলের জন্য আইনি প্রক্রিয়া চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বেনজীরকে শর্তসাপেক্ষে জামিন দেওয়া হয়েছে এবং শর্তের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত ত্যাগ না করার বিষয়টি রয়েছে। আদালতের আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। সরকারের পক্ষ থেকে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় এগিয়ে জামিন বাতিল করে দ্রুত বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

মুক্তির খবর দুদকও পেয়েছে সংবাদমাধ্যমে
বেনজীর আহমেদের মুক্তির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছেও আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য নেই বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম। রোববার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, দুদকও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই বিষয়টি জানতে পেরেছে।

দুদকের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে গাফিলতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন না। আন্তঃদেশীয় অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে কাজ করে। দুদকের পক্ষ থেকে যা যা করার এবং যে নথি পাঠানোর প্রয়োজন ছিল, তা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বেনজীরকে কোন গ্রাউন্ডে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি না জেনে এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয়। তিনি জানান, পারস্পরিক আইনি সহায়তার অনুরোধ বা এমএলএ দুদক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশে তা পাঠানো হয়।

প্রত্যর্পণের উদ্যোগের মধ্যেই জামিন
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থপাচার, পাসপোর্ট জালিয়াতিসহ একাধিক অভিযোগে মামলা ও তদন্ত চলছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠানো হয়েছে।

দুদক গত ১৬ জুন বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য ইংরেজি ও আরবি ভাষায় দুটি প্রত্যর্পণ প্রস্তাবনা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। বিদেশে কোনো আসামি গ্রেপ্তার হলে তাকে দেশে ফেরাতে তদন্তকারী সংস্থা বা আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, এজাহার, অভিযোগপত্র ও অপরাধের বিস্তারিত বিবরণসহ প্রয়োজনীয় নথি দিয়ে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব তৈরি করা হয়। এরপর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া রয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবির ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) গত ১২ জুন বাংলাদেশের এনসিবিকে চিঠি দিয়ে বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানায়। ওই চিঠিতে দেশটির ‘ফৌজদারি বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা সংক্রান্ত’ ফেডারেল আইন নং ৩৯/২০০৬-এর ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তির প্রত্যর্পণের জন্য ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন পাঠানোর কথা জানানো হয়।

এর আগে ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল পুলিশ অর্গানাইজেশন, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি হয়। দুর্নীতির দুই মামলার তদন্তের সময় আদালতের নির্দেশনায় রেড নোটিশ জারির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিল দুদক। ওই রেড নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ বেনজীরকে গ্রেপ্তার করে বলে সূত্রগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এরপর বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত করে তাকে দেশে ফেরাতে প্রত্যর্পণের আবেদন পাঠায়। পরবর্তী সময়ে বেনজীরকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সম্মতির পাশাপাশি আরও কিছু তথ্য ও ব্যাখ্যা চেয়ে বাংলাদেশকে চিঠি দেয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ। এসব নথি ও তথ্য আদান-প্রদানের মধ্যেই তার জামিনে মুক্তির খবর সামনে আসে।

জামিন বাতিলের চেষ্টা সরকারের
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, সরকার বেনজীরের জামিন বাতিলের চেষ্টা করবে। তিনি জানান, আদালতের আদেশের সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করে জামিনের শর্তগুলো যাচাই করা হবে। এরপর নিয়োগ করা ল’ ফার্মের মাধ্যমে আইনি প্রক্রিয়া চালানো হবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদও রোববার বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। রাজধানীর একটি হোটেলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আমিরাত কর্তৃপক্ষ বাংলাদেশের কাছে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য ও নথি চেয়েছিল। স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেই তথ্য ও নথি ইতোমধ্যে সরবরাহ করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব আইন অনুযায়ী দেশটির কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

শামা ওবায়েদ বলেন, সব ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে এনে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার সম্পন্ন করার চেষ্টা করছে সরকার। এ বিষয়ে পরবর্তী কার্যকর পদক্ষেপ কী হবে, তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বেনজীরের বিরুদ্ধে যেসব মামলা
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা বেনজীর আহমেদ ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইজিপির দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার এবং র‍্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র‍্যাবের সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয়। তাদের মধ্যে বেনজীর আহমেদের নামও ছিল।

২০২৪ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর দুদক অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে বেনজীর দেশ ছাড়েন। পরে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয় এবং আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।

দুদকের করা মামলাগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ১২ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন ও সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে মামলা করা হয়। ওই মামলায় আদালতে চার্জশিটও দাখিল হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ পেয়ে বেনজীর ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট আইনজীবীর মাধ্যমে সম্পদ বিবরণী জমা দেন। সেখানে তিনি ৫ কোটি ৬৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৫ টাকার স্থাবর এবং ৫ কোটি ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৯৬৬ টাকার অস্থাবর সম্পদের তথ্য দেন।

তদন্তে তার ঘোষিত সম্পদের মধ্যে ২ কোটি ৬২ লাখ ৮৯ হাজার ৬০ টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং ৯ কোটি ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ৭৫১ টাকার সম্পদের বৈধ উৎস দেখাতে ব্যর্থ হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বলে দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এসব অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৬(২) ও ২৭(১) ধারায় অভিযোগ আনা হয়।

এ ছাড়া পরিচয় গোপন করে পাসপোর্ট নবায়ন ও জালিয়াতির অভিযোগে ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর বেনজীর আহমেদসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা হয়। ওই মামলায় বেনজীর ছাড়াও পাসপোর্টের সাবেক পরিচালক ফজলুল হক, মুন্সী মুয়ীদ ইকরাম, টেকনিক্যাল ম্যানেজার সাহেনা হক এবং বিভাগীয় পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুনকে আসামি করা হয়েছে। এ মামলায়ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।

দুদকের তথ্যমতে, বেনজীরের পরিবারের বিরুদ্ধে ৭৪ কোটি টাকার বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে করা চারটি মামলাসহ পাসপোর্ট জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগ মিলিয়ে মোট ছয়টি মামলার তদন্ত চলছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৩৪৫ বিঘা জমিসহ বিপুল সম্পদের সন্ধান পাওয়ার কথাও জানিয়েছে দুদক।

এখন নজর প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায়
বেনজীর আহমেদের জামিনে মুক্তির খবর এমন সময়ে এসেছে, যখন তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে আইনি ও কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছে। আদালতের শর্ত অনুযায়ী তার পাসপোর্ট আদালতের হেফাজতে থাকার কথা এবং অনুমতি ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ছাড়ার সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পারিবারিক সূত্রের বরাতে একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জামিনের শর্ত থাকলেও বেনজীর দুবাই থেকে ইউরোপের একটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এই তথ্যের বিষয়ে বাংলাদেশের পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এখন সরকারের মূল লক্ষ্য বেনজীরের জামিন বাতিলের আইনি উদ্যোগ নেওয়া এবং প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া এগিয়ে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালতের আদেশ, জামিনের সুনির্দিষ্ট শর্ত এবং পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ওপরই তার দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়ার পরবর্তী গতি নির্ভর করছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে