রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বাড়লেও কমছে না ভোগান্তি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:১৫ এএম
রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ধারাবাহিকভাবে ব্যয় বাড়লেও কমছে না ভোগান্তি

রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ধারাবাহিকভাবে সরকারি ব্যয় বাড়লেও কমছে না জনভোগান্তি। বরং তীব্র হচ্ছে। বৃষ্টি হলেও পানির নিচে তলিয়ে রাজপথে সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতা। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়ায় অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি জমে স্থবির হয়ে পড়ছে জনজীবন। রাজধানীর এমন অবস্থা নিরসনে শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ নয়, বরং প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামো ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনা ছাড়া সম্ভব নয় এ সংকটের স্থায়ী সমাধান। ঢাকায় এখনো শহরব্যাপী কোনো সমন্বিত সবুজ অবকাঠামো বা জলসংবেদনশীল বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। মূলত বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্ব বিভক্ত থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। নগর পরিকল্পনাবিদ, ওয়াসা এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের ১৪১টি এলাকাকে জলাবদ্ধতাপ্রবণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চলতি বছরের বৃষ্টিতে ওসব এলাকাগুলোতেই দীর্ঘ সময় জমে ছিল পানি। বিভিন্ন স্থানে ড্রেনে প্লাস্টিক, পলিথিন ও কঠিন বর্জ্য জমে পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারেনি। আবার কোথাও খাল দখল, কোথাও ড্রেনের মুখ বন্ধ থাকায় আরও জটিল রূপ নেয় পরিস্থিতি। অথচ রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে সরকারি ব্যয়। বিগত ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের আওতায় প্রায় ৩৩৪ কিলোমিটার ড্রেন ও বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। তাতে ব্যয় হয় ২৬২ কোটিরও বেশি টাকা। তাছাড়া  প্রতি বছর আলাদা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে খাল পুনরুদ্ধার, ড্রেন পরিষ্কার, পাম্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও। বর্তমানে রাজধানীর পানি নিষ্কাশন ও খাল উন্নয়নে হাজার কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। কিন্তু তারপরও বর্ষা এলেই রাজধানীর বিস্তীর্ণ এলাকায় জলাবদ্ধতায় তীব্র জনভোগান্তি সৃষ্টি করছে।

সূত্র জানায়, রাজধানীতে গত ৩০ বছরে ব্যাপক নির্মাণ হলেও সে অনুপাতে কার্যকর ও টেকসই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। যা সাম্প্রতিক টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতেই রাজধানীতে জলাবদ্ধতার সঙ্কট পড়েছে। রাজধানীর খাল-নালা রক্ষণাবেক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসন ইতিপূর্বে ঢাকা ওয়াসার ড্রেনেজ বিভাগের প্রধান দায়িত্ব ছিল। কিন্তু ওয়াসা ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করলেও দীর্ঘ সময়েও সিটি কর্পোরেশন গড়ে তুলতে পারেনি পূর্ণাঙ্গ ড্রেনেজ বিভাগ। এখনো ওই বিভাগে প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল ও অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পানি জমে যায়। বিগত ২০২০ সালে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন রাজধানীর স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসা থেকে গ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে যুক্তি ছিল, সড়ক, খাল, ড্রেন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে এলে সমন্বয় বাড়বে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে গতি আসবে। সেজন্য ২৬টি খাল, স্টর্ম স্যুয়ার ও বক্স কালভার্ট দুই সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু বিগত সাড়ে ৫ বছর পরও রাজধানীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিতে প্রত্যাশিত উন্নতি দৃশ্যমান হয়নি।

সূত্র আরো জানায়,  সামপ্রতিক বিশ্বব্যাংকের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ঢাকার স্যানিটেশন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। মাত্র ২০ শতাংশ বাসিন্দা পাইপলাইনভিত্তিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, খাল দখল, দূষণ ও দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে ক্রমেই চাপে পড়ছে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমপ্রতি ৩৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের ‘মেট্রো ঢাকা ওয়াটার সিকিউরিটি অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম’ অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক।

এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষকদের মতে,  বর্তমানে ঢাকা জলবায়ু ও বন্যা-ঝুঁকিপূর্ণ মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-জলাশয় ভরাট, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ, বর্জ্যে ড্রেন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিস্থিতি জটিল রূপ নিয়েছে। শুধু কংক্রিটনির্ভর ড্রেনেজ ব্যবস্থা দিয়ে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রকৃতিভিত্তিক বা সবুজ অবকাঠামো, জলাধার সংরক্ষণ এবং বৃষ্টির পানি ধারণ ও শোষণের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সেজন্য প্রকল্প-পরবর্তী নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, খাল ও জলাধার সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধারণ ও শোষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সবুজ অবকাঠামো সমপ্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তা নাহলে প্রতি বছরই নতুন প্রকল্প ও বাড়তি বরাদ্দের পরও রাজধানীবাসীকে একই দুর্ভোগের মুখোমুখি হতে হবে।

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান জানান, রাজধানীর জলাবদ্ধতা বাড়ার পেছনে পাবলিক অসচেতনতা, স্লুইস গেট বন্ধ হয়ে যাওয়া, ড্রেনেজ পথের দূরত্ব বেশি হওয়া, জলাশয় কমে যাওয়া, ঢাকায় ক্যাপাসিটির তুলনায় বিপুল লোকের বসবাসসহ বেশ কিছু কারণে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে তার মধ্যে মানুষের অসচেতনতা অন্যতম কারণ। এখন জলাবদ্ধতা কমাতে ড্রেনেজ ডিজাইন পরিবর্তন, পানি নামার জন্য রাস্তার দূরত্ব কমানোসহ বেশকিছু পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। তবে জনবলের ঘাটতি রয়েছে। এখনো সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব ড্রেনেজ সার্কেল চালু হয়নি। জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে তা অনুমোদনের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে কিন্তু এখনো অনুমোদন হয়নি। জলাবদ্ধতা নিরসনে যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায় নগরবাসীর ভোগান্তি কমবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে