ঢামেকে চিকিৎসক-কর্মচারী সংঘর্ষ, পরিচালকের পদত্যাগ দাবিতে কক্ষে অবস্থান

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
ঢামেকে চিকিৎসক-কর্মচারী সংঘর্ষ, পরিচালকের পদত্যাগ দাবিতে কক্ষে অবস্থান
ছবি: সংগ্রহীত

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি ও নতুন কর্মকর্তার যোগদানকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং মারামারির ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরে হাসপাতালের প্রশাসনিক ব্লকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামানের কক্ষে ঢুকে তার পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান নেয়। এতে নিজের কক্ষেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন পরিচালক।

প্রায় দুই ঘণ্টা অবস্থানের পর দুপুর ২টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে বিক্ষোভকারী চিকিৎসকরা পরিচালকের কক্ষ থেকে সরে যান। একই সময়ে কর্মচারীদের একটি অংশ প্রশাসনিক ব্লকের বাইরে অবস্থান নিয়ে তাদের সহকর্মীকে মারধরের ঘটনার বিচার দাবি করেন।

ঘটনার সূত্রপাত মূলত হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. রেজাউল ইসলামের বদলি এবং নতুন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোজাম্মেল হকের যোগদানকে কেন্দ্র করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২৮ জুলাই এক প্রজ্ঞাপনে ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে ঢামেকে বদলি করে।

বদলি আদেশের পর মোজাম্মেল হক ঢামেক হাসপাতালে যোগ দিতে এলেও তার যোগদানের কাগজ গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। অন্যদিকে রেজাউল ইসলামও ঢামেক হাসপাতালে আগের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। বিষয়টি নিয়ে কয়েক দিন ধরে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে দুই ধরনের অবস্থান তৈরি হয়।

চিকিৎসকদের একটি পক্ষের দাবি ছিল, বদলি হওয়া মোজাম্মেল হককে ঢামেক হাসপাতালে যোগদানের সুযোগ দিতে হবে। এ নিয়ে তারা পরিচালকের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকও করেন। অভিযোগ রয়েছে, ড্যাবের ডা. জাবেদ-সমর্থিত একটি পক্ষ মোজাম্মেল হককে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করানোর চেষ্টা করছিল।

এরই মধ্যে সোমবার (১০ আগস্ট) বদলি কার্যকর হওয়া নিয়ে উত্তেজনা আরও বাড়ে। কয়েকজন চিকিৎসক প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের কক্ষে তালা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় হাসপাতালের তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী মো. হানিফের কাছে তালা চাওয়া হয়। পরে হানিফকে মারধর করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

হানিফকে মারধরের অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। তারা হাসপাতাল এলাকায় প্রতিবাদ মিছিল করেন এবং ঘটনার বিচার দাবি করেন। কর্মচারীদের বক্তব্য, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করার সময় হানিফকে মারধর করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও জানান তারা।

মঙ্গলবার কর্মচারীদের একটি অংশ এ ঘটনায় লিখিত স্মারকলিপি দিতে পরিচালকের কাছে আসেন। কিন্তু এর আগেই চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা পরিচালকের কক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তারা ভেতরে যেতে পারেননি। ফলে পরিচালকের কক্ষের বাইরে অবস্থান নেন কর্মচারীরা।

ঢামেক হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী সমিতির সভাপতি মো. আজিম বলেন, তাদের কর্মচারী মো. হানিফকে মারধরের ঘটনায় তারা পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দিতে এসেছেন। তিনি বলেন, “আমাদের কর্মচারীর গায়ে কেন হাত দেওয়া হলো, সেটির বিচার আমরা চাই।”

অন্যদিকে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পেয়েছেন এবং তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসায় বাধা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার বদলি ঠেকানোরও অভিযোগ তোলেন তারা।

কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া চিকিৎসক ও ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. সাইফুল আলম বাদশা পরিচালকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ দাবি করেন। তিনি পরিচালককে “ফ্যাসিস্টের দোসর” হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, পরিচালক পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাদের অবস্থান কর্মসূচি চলবে।

বিক্ষোভকারী চিকিৎসকদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া পরিচালককে দ্রুত পদত্যাগ করতে হবে। তাদের বক্তব্য, পরিচালক পদত্যাগ করলেই তারা পরিচালকের কক্ষ থেকে অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করবেন।

এদিকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা রেজাউল ইসলামের বদলি নিয়েও নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া বদলি আদেশ পরে বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যেই নতুন কর্মকর্তার যোগদান এবং পুরোনো কর্মকর্তাকে দায়িত্বে রাখাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়।

এর আগে রেজাউল ইসলাম জানিয়েছিলেন, ঢামেক হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ছাড়পত্র না পাওয়ায় তিনি নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে পারেননি। অন্যদিকে মোজাম্মেল হকও অভিযোগ করেছিলেন, ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক তার যোগদানের কাগজ গ্রহণ করছেন না।

মোজাম্মেল হকের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালক তাকে জানিয়েছিলেন, রেজাউল ইসলামকে ঢামেকে রাখার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কার্যালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে এবং সেখানকার সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

এই বিরোধের মধ্যেই মঙ্গলবার প্রশাসনিক ব্লকে দুই পক্ষ মুখোমুখি হয়। একপর্যায়ে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটে। এতে প্রশাসনিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় মো. হানিফ ভূঁইয়া নামে এক কর্মচারী আহত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

চিকিৎসকদের অবস্থানের সময় পরিচালকের কক্ষের ভেতরে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন। এর মধ্যে “দফা এক, দাবি এক, পরিচালকের পদত্যাগ” স্লোগানও ছিল। বাইরে কর্মচারীদের একটি অংশ হানিফকে মারধরের ঘটনার বিচার দাবি করতে থাকেন।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনিক এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ড্যাব নেতাদের হস্তক্ষেপে দুপুর ২টার দিকে পরিস্থিতি শান্ত হয়। ড্যাব মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, সবাই কাজে ফিরে গেছেন এবং সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বৈঠকে বসেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুত জটিলতার সমাধান হবে।

ঢামেক হাসপাতালের পরিচালকের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার মধ্য দিয়ে ঢামেক হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার বদলি ও যোগদান নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলা বিরোধ প্রকাশ্যে আরও তীব্র রূপ নেয়। একদিকে চিকিৎসকরা পরিচালকের পদত্যাগ চাইছেন, অন্যদিকে কর্মচারীরা তাদের সহকর্মীকে মারধরের অভিযোগের তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা দাবি করছেন। ফলে প্রশাসনিক ব্লকে দিনভর উত্তেজনা বিরাজ করে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে