পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা চলবে না, চট্টগ্রাম বন্দরে কড়া বার্তা অর্থমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ১১ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪৫ পিএম
পৃষ্ঠপোষকতার ব্যবসা চলবে না, চট্টগ্রাম বন্দরে কড়া বার্তা অর্থমন্ত্রীর
ছবি: সংগ্রহীত

চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, স্বজনপ্রীতি বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ বরদাশত করা হবে না বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মন্ত্রী কিংবা যতই ক্ষমতাবান ব্যক্তি হোন, পরিচয় বা প্রভাব দেখিয়ে ব্যবসায়িক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ থাকবে না।

মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) চট্টগ্রাম বন্দর ভবনে কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বন্দর ভবনে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), কাস্টমস, চট্টগ্রাম চেম্বার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, শিপিং এজেন্টসহ বন্দর সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে বন্দর ও কাস্টমসের মধ্যে বিদ্যমান জটিলতা, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা, অতিরিক্ত খরচ এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়।

আমির খসরু বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে প্রথমে স্থিতিশীল করা এবং পরে উচ্চ প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বাড়ানো, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং ব্যবসার পরিবেশ সহজ করাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

ব্যবসা সহজ করার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বিধিনিষেধ ও জটিলতা কমাতে বাজেটে ডিরেগুলেশনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। এরই অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম আরও সমন্বিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, কাস্টমসের জটিলতা এবং বন্দরে অতিরিক্ত খরচের প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে। পণ্য আমদানি ও খালাসে সময় ও খরচ বাড়লে তার প্রভাব বাজারদরেও পড়ে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়।

এ কারণে বৈঠকে সমস্যাগুলো আলাদাভাবে চিহ্নিত করে সমাধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। কোন সিদ্ধান্ত কত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিও নির্ধারণ করা হয়েছে।

পোর্ট ও কাস্টমসের মধ্যে একটি যৌথ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তের কথাও জানান অর্থমন্ত্রী। তার ভাষায়, দুই পক্ষকে একসঙ্গে বসে সমস্যার সমাধান করতে হবে। এই কমিটি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রম আরও কার্যকর হবে। পণ্য খালাস ও রপ্তানি কার্যক্রমে সময় কমবে, ব্যবসায়ীদের খরচ কমবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশের পণ্য আমদানিকারকদের আস্থাও বাড়বে।

আমির খসরু বলেন, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বাধা তৈরি হলে খরচ বাড়ে। বন্দরে বা কাস্টমসে বাড়তি খরচ হলে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়। তাই ব্যবসার খরচ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্যও বন্দর ও কাস্টমসের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি।

বন্দরের পরিচালনা কার হাতে থাকবে, সেটি বড় বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী। তার বক্তব্য, বন্দর দেশি বা বিদেশি যে পক্ষই পরিচালনা করুক, জনগণ, ব্যবসায়ী, শিল্প এবং দেশের অর্থনীতির স্বার্থে নির্ধারিত নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

এনসিটি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব যার কাছেই থাকুক, তাকে দেশের স্বার্থ এবং ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে একই নীতির অধীনে কাজ করতে হবে।

বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতিকে সহজ করতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ডিরেগুলেশন এবং কর কমানোর মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এ ছাড়া বড় পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগ আসছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

চট্টগ্রামকে ঘিরে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) বড় পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, চট্টগ্রামকে শুধু একটি লজিস্টিকস হাব হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের অগ্রপথিক হিসেবে দেখতে চায় এডিবি।

এডিবির ভাইস প্রেসিডেন্ট ফিলিপাইন থেকে চট্টগ্রামে এসে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করছেন বলে জানান তিনি। বন্দর, লজিস্টিকস এবং অন্যান্য অবকাঠামোকে ঘিরে এ অঞ্চলের জন্য এডিবির বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন অর্থমন্ত্রী।

অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়া। চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসের কার্যক্রমে গতি আনা সেই বৃহত্তর অর্থনৈতিক লক্ষ্য পূরণের পথকে সহজ করবে বলে তিনি মনে করেন।

বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আমিরুল হক, এস এম সাইফুল আলম ও সাইফুল্লাহ মনসুর কাস্টমসের জটিলতা কমানো এবং ডিরেগুলেশনের মাধ্যমে শিল্প ও ব্যবসার খরচ কমানোর দাবি জানান। তাদের দাবিগুলো বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন অর্থমন্ত্রী।

ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান, চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক, সিঅ্যান্ডএফ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট এস এম সাইফুল আলম এবং বিজিএমইএর পরিচালক সাইফুল্লাহ মনসুর উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে