দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা খুলনা ও সিরাজগঞ্জের তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু করতে ইজারা দিয়েছে সরকার। প্রাণ-আরএফএল ও হ্যামকো গ্রুপ মিলগুলোতে মোট প্রায় ১ হাজার ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এসব কারখানা চালু হলে প্রায় ১৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) সঙ্গে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ ও হ্যামকো গ্রুপের এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এ তথ্য জানান।
চুক্তি অনুযায়ী, খুলনার খালিশপুরের প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিল ৩০ বছরের জন্য ইজারা পেয়েছে হ্যামকো গ্রুপের প্রতিষ্ঠান আবদুল্লাহ ব্যাটারি কোম্পানি। অন্যদিকে খুলনার দিঘলিয়ার স্টার জুট মিলস এবং সিরাজগঞ্জের রায়পুরের জাতীয় জুট মিলস ইজারা পেয়েছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ।
বিজেএমসির মুখ্য পরিচালন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মামনুর রশিদ জানান, প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতেই ইজারা চুক্তির আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ স্টার জুট মিলস ও জাতীয় জুট মিলসে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। দুটি কারখানায় উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পাটজাত পণ্য, আসবাব, এমডিএফ বোর্ড, তৈরি পোশাক, হস্তশিল্প, ব্যাগ, জুতা ও খেলনাসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক কাঁচামাল, প্যাকেজিং ও পণ্য সংরক্ষণের সুবিধাও গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, ইজারা পাওয়া দুটি কারখানায় দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি রপ্তানির জন্যও পণ্য উৎপাদন করা হবে। দ্রুত উৎপাদনে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির।
অন্যদিকে প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে হ্যামকো গ্রুপ। সেখানে বিশেষায়িত পাটের ম্যাট্রেস এবং লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের জন্য দুটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
হ্যামকো গ্রুপের কোম্পানি সচিব রেজাউল করিম জানান, বিজেএমসি তিন মাসের মধ্যে মিলটি বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। মিল বুঝে পাওয়ার পর কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করে এক বছরের মধ্যে দুটি কারখানাই চালুর প্রত্যাশা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম বলেন, বন্ধ থাকা আরও কিছু কলকারখানা আগামী ছয় মাসের মধ্যে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা শিল্পকারখানাগুলো পুনরায় চালুর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তিনটি পাটকল বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো দীর্ঘদিন লোকসানে থাকার পর ২০২০ সালের ১ জুলাই বিজেএমসির ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিককে গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসরে পাঠানো হয়। এরপর বন্ধ মিলগুলো বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার।
বিজেএমসির তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদন বন্ধ থাকা ২৫টি মিলের মধ্যে ২০টি ইজারার ভিত্তিতে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪টি পাটকল ইজারা দেওয়া হয়েছে এবং লিজগ্রহীতাদের কাছে দখল হস্তান্তর করা হয়েছে। এসবের মধ্যে ৯টি মিলে উৎপাদনও শুরু হয়েছে। চালু হওয়া কারখানাগুলোতে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে বলে জানিয়েছে বিজেএমসি।
নতুন করে ইজারা পাওয়া তিনটি মিলের মধ্যে খুলনার স্টার জুট মিলসের আওতায় ৪৫ দশমিক ৯৯ একর এবং সিরাজগঞ্জের জাতীয় জুট মিলসের আওতায় ৩৭ দশমিক ৯৭ একর জমি রয়েছে।
জাতীয় জুট মিলসে নিটওয়্যার, ওভেন গার্মেন্টস, ডেনিম পণ্য, জ্যাকেট, ওয়াশিং প্ল্যান্ট, হস্তশিল্প, ব্যাগ, ফুটওয়্যার ও খেলনা উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক কাঁচামাল, প্যাকেজিং এবং পণ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্টার জুট মিলসে পরিবেশবান্ধব ও আধুনিক শিল্পকারখানা গড়ে তুলে মূল্য সংযোজিত পাটজাত পণ্য, ফার্নিচার ও এমডিএফ বোর্ডসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে প্লাটিনাম জুবিলী জুট মিলসে বিশেষায়িত পাটের ম্যাট্রেস ও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনের কথা রয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের ফলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা তিনটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান আবার উৎপাদনে ফেরার সুযোগ পাচ্ছে। একই সঙ্গে পাটভিত্তিক নতুন পণ্য, তৈরি পোশাক, জুতা, খেলনা, আসবাব ও ব্যাটারি উৎপাদনের মাধ্যমে শিল্প ও কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।