জুলাই আন্দোলনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় দুই শতাধিকের প্রাণহানি

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ১২ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম | প্রকাশ: ১২ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
জুলাই আন্দোলনের পর থেকে রাজনৈতিক সহিংসতায় দুই শতাধিকের প্রাণহানি

দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি বাড়ছে। জুলাই আন্দোলনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ৯৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ২১৩ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। যদিও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক সহিংসতা কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। বরং ক্ষমতার লড়াইয়ে তা বেড়েছে। আর ওসব রাজনৈতিক সংঘাতে এক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আরেক দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের চেয়ে একই দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বই প্রাণহানির বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত প্রভাব বিস্তার, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাত বেড়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং মানবাধিকার সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে গত দুই বছরে দেশে ঘটেছে অনেক সহিংসতার ঘটনা। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত ২২ মাসে দেশে ৯৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওসব ঘটনায় ৯ হাজার ৭৯৫ জন আহত এবং ২১৩ জন নিহত হয়েছে। ওসব রাজনৈতিক সহিংসতার অর্ধেকেরও বেশি বিএনপি ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে ঘটেছে। ওই সময়ে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ৪৯৪টি ঘটনায় ৫ হাজার ৫৮১ জন আহত এবং ১১৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। মূলত দীর্ঘদিন পর ক্ষমতার বলয়ে আসা বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার, স্থানীয় আধিপত্য এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের তীব্র প্রতিযোগিতায় বাড়ছে সংঘাত। তাছাড়া দলীয় নেতৃত্বের কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তাও পরিস্থিতিকে করে তুলেছে নাজুক। কারণ সংঘর্ষ থামাতে পুলিশের জোরালো ভূমিকা থাকার কথা থাকলেও মনোবল সংকটে তারা নীরব দর্শকের ভূমিকায় থাকছে। পুলিশের মনোবল সংকটের কারণ হচ্ছে পুলিশের ওপর বিভিন্ন সময়ে হামলার কোনো বিচার না হওয়া এবং পুলিশ হত্যার বিচার না হওয়া।

সূত্র জানায়, বিগত ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে নরসিংদীর সদর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে পাঁচদোনা ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক নিহত হয়। আর ২০২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বাঙ্গড্ডা বাজার এলাকায় বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক নিহত হয়। একই বছরের ২১ মার্চ চট্টগ্রামের খুলশীতে ইফতার বিতরণ ও ঈদ শুভেচ্ছা ব্যানার টানানো নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ওই সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে এক ছাত্রদল নেতা প্রাণ হারায়। আর চলতি ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলায় নির্বাচনি ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। তাতে শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি নিহত হয়। গত ২৩ মার্চ কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কেওয়ারজোড় ইউনিয়নের হেমন্তগঞ্জ এলাকায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন আহত হয়। রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্যে বিএনপি ও দলটির অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ৪৯৪টি অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ ঘটেছে। আর তাতে ৫ হাজার ৫৮১ জন আহত এবং ১১৮ জন নিহত হয়েছে। তাছাড়া বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৬৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওসব ঘটনায় এক হাজার ৫২৫ জন আহত এবং ১২ জন নিহত হয়। আর বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ১১১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওসব ঘটনায় আহত হয়েছেন এক হাজার ১০৬ জন। নিহত হয়েছেন ৪১ জন। তাছাড়া বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীদের মধ্যে ১৫টি সহিংসতার ঘটনায় আহত হয়েছে ১৯৭ জন। আর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও তাদের নিজেদের মধ্যে সহিসংতা বন্ধ হয়নি। গত ২২ মাসে তাদের নিজেদের মধ্যে ১৯টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। তাতে ২৩৮ জন আহত এবং ১১ জন নিহত হয়েছে। তাছাড়াও ১৪৬টি অন্যান্য রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। ওসব ঘটনায় এক হাজার ১৪৮ জন আহত এবং ৩১ জন নিহত হয়। 

সূত্র আরো জানায়, দেশের রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ন্ত্রণে পুলিশ বাহিনী কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। আবার অনেক ক্ষেত্রেই সব দল এক হয়ে পুলিশকেই হামলা করছে। তাছাড়া জুলাই আন্দোলনে পুলিশ হত্যার বিচার হয়নি। এখনো পুলিশের ওপর হামলা হলে কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। বর্তমানে পুলিশের ওপর অনেক হামলা হচ্ছে। যেকোনো কারণে সবাই এক হয়ে পুলিশের ওপর হামলা করে। পুলিশের ওপর হামলার ক্ষেত্রে বিএনপি নেতাকর্মী-জামায়াত-এনসিপি সবারই আগ্রহ। পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। 

এদিকে এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, পুলিশের হামলার শিকারের একটা বড় কারণ হচ্ছে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যতোটুকু বল প্রয়োগ করা দরকার, ওই স্ট্যান্ডার্ড ফলো করছে পুলিশ সদস্যরা। জনসাধারণকেও আইন মানার টেন্ডেন্সিটা বাড়াতে হবে। পুলিশের ওপর হামলার প্রতিটা ক্ষেত্রেই মামলা রুজু হয়েছে এবং ইতোপূর্বে পুলিশের ওপর যারা হামলা করেছে তাদের অনেকেই গ্রেফতার হয়েছে। আর যারা গ্রেফতার হয়নি তাদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। এই মুহূর্তে পুলিশ বেশ চাঙা। তবে মানুষের আইন মানার প্রবণতা বাড়ালে পুলিশের মনোবল আরেকটু চাঙা হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে