পল্লী উন্নয়নে বাড়ছে এমপির থোক বরাদ্দ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ | প্রকাশ: ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২৮ এএম
পল্লী উন্নয়নে বাড়ছে এমপির থোক বরাদ্দ

পল্লী উন্নয়নে আড়াই গুণ বাড়ানো হচ্ছে এমপিদের থোক বরাদ্দ। অগ্রাধিকার বিবেচনায় এমপিরা নিজ নির্বাচনী এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট নির্মাণ ও মেরামত, হাটবাজার, ঘাট উন্নয়ন, বৃক্ষরোপণসহ অন্যান্য উন্নয়নে ওই অর্থ ব্যবহার করতে পারবে। বিগত ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তৎকালীন বিএনপি সরকার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ওই  বিশেষ বরাদ্দ শুরু করেছিলো। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারও ওই খাতে ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে বরাদ্দ। প্রকল্পের আওতায় ২০০৫ সালে আসনপ্রতি ২ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ দেয়া হলেও পরবর্তীতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ কোটিতে দাঁড়ায়। কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পটি আর অনুমোদন পায়নি। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার আবারো ওই প্রকল্পের উদ্যোগ নিয়েছে। আর এবার এমপিদের জন্য প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা থোক বরাদ্দ ধরা হয়েছে। এলজিইডি এবং পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বিগত সরকারের ধারাবাহিকতায় এবারো এমপিদের থোক বরাদ্দের প্রকল্পটি নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এবার বাড়ানো হচ্ছে এমপিদের বরাদ্দও। এর আওতায় রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট মেরামত, পুনর্বাসন করা যাবে। তবে বড় নির্মাণকাজ করা হবে না। অবশ্য অতীতে ওসব প্রকল্প ভাগাভাগি হতে দেখা গেছে। বরাদ্দ ব্যয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা কঠিন। থোক বরাদ্দ হিসেবে প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ বিভাগের এমপিদের ৫০ কোটি টাকা করে দেয়া হচ্ছে। প্রতি বছর এমপিরা ১০ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ ব্যয়ের সুযোগ পাবে। ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের জন্য গত মে মাসে এলজিইডি ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প ময়মনসিংহ বিভাগ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়। তার জন্য ১ হাজার ৪৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব দেয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রায় ৫৬৯ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন, ৮৬৭ মিটার ব্রিজ নির্মাণ এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪২০টি গাছ রোপণ করা হবে। ময়মনসিংহ বিভাগ কৃষি, শিল্প ও পর্যটন এলাকা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবং ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করতে এই পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যদিও পল্লী উন্নয়নের নামে এমপিদের দেয়া থোক বরাদ্দ ঘিরে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। এবারও তেমনটি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, গ্রামীণ রাস্তাঘাট মেরামত ও অবকাঠামো উন্নয়নে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি আসনে ৫০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ হলেও তা প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম বলে স্থানীয় এমপিরা মনে করছেন। তাদের মতে, অনেক এলাকায় এখনো ৯০ শতাংশ কাঁচা রাস্তা, আবার অনেক এলাকায় ব্রিজ-কালভার্ট করতে হবে। রাষ্ট্র মেরামতে গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে পল্লী ও প্রত্যন্ত গ্রামে। মূলত শহর ও গ্রামের মানুষের মধ্যে একটা সংযোগ তৈরি করতেই প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে আরো বাড়ানো প্রয়োজন। যদিও এমন প্রকল্পে অতীতে দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছে। 

সূত্র আরো জানায়, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বিগত ২০২০ সালে ‘অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প’র আওতায় করা ৬২৮টি কর্মসূচি নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো। তাতে উঠে আসে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ শতাংশ হারে কমিশন বাণিজ্য হয়। তাছাড়া পরিবারের সদস্য, দলীয় নেতাকর্মী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক সুযোগ দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। আবার ৩৩ শতাংশ স্কিমে কাজের মান ভালো ছিল না। মূলত সংসদীয় আসনভিত্তিক থোক বরাদ্দের মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়নের নামে জনগণের অর্থের বহুমাত্রিক দুর্নীতি, অনিয়ম, অপচয় ও আত্মসাৎ হয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়নেও ভুয়া বিল তৈরি, কাজে নিম্নমানের সামগ্রীর ব্যবহার, রাজনৈতিক ও স্বজনপ্রীতি, কমিশন বাণিজ্যের চিত্র মিলেছে। কারণ থোক বরাদ্দের প্রকল্পে এমপিদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেয়া হয়। ফলে তারা স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ পায়।

অন্যদিকে থোক বরাদ্দে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, আগের প্রকল্প শেষ হওয়ায় পল্লী উন্নয়নের নতুন প্রকল্প নেয়া হয়েছে। ময়মনসিংহ বিভাগ ওই প্রকল্প প্রথমে বাস্তবায়ন হবে। প্রকল্পের ডিপিপি পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে অন্য বিভাগের জন্যও করা হবে। এমপিরা কাজের প্রস্তাব দেন আর সে অনুসারে এলজিইডি তা বাস্তবায়ন করে।

পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প যাচাই কমিটির (পিইসি) সভা গত ২৩ মে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রকল্পের সমীক্ষা, ব্যয় বিভাজনে পুনর্মূল্যায়ন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার এলাকার বাইরে স্কিম বাস্তবায়ন করতে বলা হয়। সেই সঙ্গে এ সিদ্ধান— ডিপিপিতে যুক্ত করতে বলা হয়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে