দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ

এফএনএস এক্সক্লুসিভ
| আপডেট: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:২১ এএম | প্রকাশ: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:২১ এএম
দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ

দেশে ক্ষতিকর কীটনাশকের অপব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ওই লক্ষ্যে প্রণয়ন করা হচ্ছে নতুন নীতিমালা। যাতে দেশে কীটনাশকের ব্যবহারকে আরো বিজ্ঞানভিত্তিক, সীমিত ও পরিবেশবান্ধব করা যায়। ওই নীতিমালার মাধ্যমে কীটনাশকের মান নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পাশাপাশি চিহ্নিত অতিমাত্রায় ক্ষতিকর কীটনাশক ধাপে ধাপে নিষিদ্ধ বা কঠোর নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে গত জুলাইয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়। ওই কমিটি টেকসই কৃষি ও নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যে বিদ্যমান বালাইনাশক আইন, বিধিমালা, নিবন্ধন, লাইসেন্সিং, মান নিয়ন্ত্রণ, গবেষণাগার ও মনিটরিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে গাইডলাইন দেবে। তাতে মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি বালাইনাশকের আমদানি, উৎপাদন ও পরিমিত ব্যবহার নিশ্চিত করার দিকনির্দেশনা থাকবে। পাশাপাশি আমদানি করা কীটনাশক কৃষকের হাতে পৌঁছার আগে সেটি টেস্টের বিষয়ও থাকবে। কৃষি বিশেষজ্ঞ এবং কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশে চাষাবাদ বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে কীটনাশক ও বালাইনাশকের ব্যবহারও। ফসলের নিবিড় চাষ, উচ্চফলনশীল জাতের বিস্তার এবং সবজি ও ফল উৎপাদন গত এক দশকে দেশে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত ২০১৫ সালে দেশে ৩৫ হাজার ৫২৩ টন কীটনাশক ব্যবহার হয়। আর ২০২৪ সালে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার হয় ৪০ হাজার ৮৩২ টন। দেশে আবাদযোগ্য কৃষিজমি ৮৮ দশমিক ২৯ লাখ হেক্টর। ওই হিসাবে হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৬২ কেজি কীটনাশক ব্যহার হয়েছে। দেশে কীটনাশকের অবাধ ব্যবহারের ধরন বড় উদ্বেগ সৃষ্টি করছে। একই জমিতে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি মাত্রায় কীটনাশক প্রয়োগ, অনুমোদনহীন মিশ্রণ তৈরি, একই সক্রিয় উপাদান বারবার ব্যবহার এবং ফসল কাটার আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্প্রে করার কারণে বাড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি। প্রায়ই বাজারের শাকসবজি ও ফলমূলেও অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বেশি কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ বা রেসিডিউ পাওয়া যায়। এ পরিস্থিতি নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাকে বিপন্ন করছে। 

সূত্র জানায়, দেশে এখনো অধিকাংশ কৃষকই কীটনাশক স্প্রে করার পর ফসল তোলার নির্ধারিত অপেক্ষার সময় যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। ফলে সরাসরি খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে রাসায়নিকের অবশিষ্টাংশ। তাছাড়া অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে মাটির উপকারী অণুজীব, পরাগায়নকারী মৌমাছি, জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও। একই কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে পোকামাকড়ের প্রতিরোধক্ষমতাও তৈরি হয়েছে। তাতে কৃষকদের আরো বেশি মাত্রায় বা আরো শক্তিশালী কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে নতুন নীতিমালায় শুধু কৃষক পর্যায়ে ব্যবহার নয়, বরং আমদানি, নিবন্ধন, উৎপাদন, বাজারজাত ও বিক্রয় অর্থাৎ পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। কোন সক্রিয় উপাদান দেশে নিবন্ধিত হবে, কোনটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বাদ পড়বে এবং কোন ক্ষেত্রে জৈব বা বায়োপেস্টিসাইডকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে ওসব বিষয়ও নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। তাছাড়া কৃষকের হাতে পৌঁছার আগেই আমদানি করা কীটনাশক ল্যাবে পরীক্ষার বিষয়টিও থাকবে।

সূত্র আরো জানায়, অতিরিক্ত কীটনাশকের প্রভাব মানবস্বাস্থ্য, প্রাণীদেহ ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই পড়ছে। বৃষ্টির পানির সঙ্গে পুকুরে গিয়ে মাছের দেহে এবং ঘাসের মাধ্যমে গবাদিপশুর দেহে প্রবেশ করছে। আর শেষ পর্যন্ত তা মানুষের শরীরেও যাচ্ছে। সেজন্য নীতিমালার মাধ্যমে জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। সেক্ষেত্রে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, বাংলায় স্পষ্ট ব্যবহারবিধি, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া জরুরি। সেক্ষেত্রে নতুন নীতিমালায় উচ্চ ঝুঁকির রাসায়নিক ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, জৈব বালাইনাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি এবং নিয়মিত রেসিডিউ মনিটরিং কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের পাশাপাশি দেশের কৃষিপণ্য রফতানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পর্যায়ক্রমে অতিমাত্রায় ঝুঁকিপূর্ণ কীটনাশক প্রত্যাহারের সুপারিশ করে আসছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন রফতানি বাজারে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশের সর্বোচ্চ অনুমোদিত মাত্রা (এমআরএল) আরো কঠোর হওয়ায় বাংলাদেশের কৃষিপণ্য রফতানির ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. খন্দকার শরিফুল ইসলাম জানান, আমদানি করা কীটনাশক কৃষকের হাতে যাওয়ার আগে সেগুলো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা পরীক্ষার বিষয়টি গাইডলাইনে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হবে। আমদানি করা কীটনাশকের ল্যাব পরীক্ষার ব্যবস্থাও থাকবে। দেশে এ ধরনের পরীক্ষাগারের সুবিধা সীমিত। তবে প্রবেশপথগুলোয় এক বা দুটি পরীক্ষাগার স্থাপন করা যেতে পারে। সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে পরীক্ষা করে কীটনাশকে কোনো ক্ষতিকর উপাদান, ভারী ধাতু বা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ অন্য কিছু রয়েছে কিনা, তা যাচাই করা হবে। পাশাপাশি আমদানি করা পণ্যের তথ্যও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। কোনো ত্রুটি পাওয়া গেলে কৃষকের হাতে পৌঁছার আগেই সেটির সরবরাহ বন্ধ করা যাবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে