অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ইতিহাস গড়ার হাতছানি এখন বাংলাদেশের সামনে। ডারউইন টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে ৪ উইকেটে ১৬১ রান করেছে। ইনিংস পরাজয় এড়াতেই তাদের প্রয়োজন আরও ৬৭ রান, হাতে আছে ৬ উইকেট। বাংলাদেশের বড় লিডের পর অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন ম্যাচ বাঁচানোর কঠিন লড়াই।
এর আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস ১৯৮ রানে গুটিয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে করে ৪২৬ রান। ফলে সফরকারীরা লিড পায় ২২৮ রানের। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম ইনিংসে এত বড় ঘাটতি পুষিয়ে এর আগে কোনো টেস্ট জেতেনি স্বাগতিকেরা। ডারউইনে তাই শুধু ম্যাচ নয়, নিজেদের টেস্ট ইতিহাসেরও একটি রেকর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে অস্ট্রেলিয়া।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের বড় কৃতিত্ব অবশ্যই লোয়ার অর্ডারের ব্যাটিংয়ের। তৃতীয় দিনের শুরুতে ৬ উইকেটে ৩৫১ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। আগের দিন অপরাজিত থাকা হাসান মাহমুদ দিনের চতুর্থ ওভারে জশ হ্যাজেলউডের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ফেরেন ১৪ রানে। রানসংখ্যা কম হলেও ৯২ বল খেলে ১৬৩ মিনিট ক্রিজে থেকে তাঁর ইনিংসটি দলের জন্য ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।
হাসানের বিদায়ে মেহেদী হাসান মিরাজের সঙ্গে সপ্তম উইকেটের জুটি থামে ৪৬ রানে। এরপর তাইজুল ইসলাম ২৩ বলে করেন ১৭ রান। তাঁর ইনিংসে ছিল একটি ছক্কা। অষ্টম উইকেটে মিরাজ ও তাইজুল যোগ করেন ১৮ রান।
এরপর তাসকিন আহমেদকে নিয়ে মিরাজ আরও ৪ রান যোগ করেন। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের হতাশ করে লোয়ার অর্ডারের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে স্ট্রাইক বদলে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাটিং করেন মিরাজ। অস্ট্রেলিয়া বাউন্সার দিয়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করলেও তা খুব একটা কাজে আসেনি।
বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কয়েকটি ক্যাচও হাতছাড়া করে অস্ট্রেলিয়া। তাসকিনের সহজ ক্যাচ ছাড়েন স্টিভেন স্মিথ, মিরাজের কঠিন ক্যাচ নিতে পারেননি ট্রাভিস হেড। শেষ পর্যন্ত ১৫৪ বলে ৬৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন মিরাজ। লাঞ্চের আগে শেষ বলে ছক্কা মেরে তিনি বাংলাদেশের দাপটেরই ইঙ্গিত দেন।
লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই মিরাজকে ফিরিয়ে দেন হ্যাজেলউড। তাঁর ৬৫ রানের ইনিংস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার নবম বোলার হিসেবে টেস্টে ৩০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন এই পেসার। ১৩ মাস পর টেস্টে ফিরে এক ইনিংসে তিনি নেন ৬ উইকেট।
শেষ দিকে ইবাদত হোসেন চৌধুরী নাথান লায়নকে বিশাল ছক্কা হাঁকান। তাসকিন ও ইবাদতের শেষ উইকেট জুটিতে আসে ৮ রান। এরপর হ্যাজেলউড ইবাদতকে ফিরিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস শেষ করেন ৪২৬ রানে।
এই ইনিংসে বাংলাদেশের হয়ে তানজিদ হাসান তামিমের সেঞ্চুরি, নাজমুল হোসেন শান্তর অর্ধশতক এবং মিরাজের ৬৫ রান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের মধ্যে হ্যাজেলউড ৬ উইকেট নেন। তাঁর এই মাইলফলকের মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট একাদশে ৩০০ বা তার বেশি টেস্ট উইকেট নেওয়া বোলারের সংখ্যা দাঁড়ায় চারজনে।
বিশাল লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নামা অস্ট্রেলিয়ার শুরুটা অবশ্য একেবারেই স্বস্তির ছিল না। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জেক ওয়েদারাল্ডকে বোল্ড করেন হাসান মাহমুদ। রানের খাতা খোলার আগেই ফেরেন অস্ট্রেলিয়ার ওপেনার।
এরপর হাসানের শিকার হন ট্রাভিস হেড। কাট করতে গিয়ে শরীরের কাছাকাছি থাকা বলে ব্যাটের সংযোগ ঘটিয়ে নিজের স্টাম্প ভেঙে ফেলেন তিনি। ফলে মাত্র ৩৭ রানের মধ্যেই দুই ওপেনারকে হারায় অস্ট্রেলিয়া।
এই ধাক্কা সামলে তৃতীয় উইকেটে ৩৬ রানের জুটি গড়েন মার্নাস লাবুশেন ও স্টিভেন স্মিথ। লাবুশেনকে দেখে তখন বেশ স্বচ্ছন্দই মনে হচ্ছিল। স্মিথও ভালো ছন্দে ছিলেন। কিন্তু সেই জুটি ভেঙে দেন তাইজুল ইসলাম। ৫৯ বলে ৩১ রান করা লাবুশেনকে বোল্ড করেন তিনি।
এরপর স্মিথ ও ক্যামেরন গ্রিন মিলে প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। তবে সেই জুটিও বেশিক্ষণ টেকেনি। মেহেদী হাসান মিরাজের বলে ফিরতি ক্যাচ দিয়ে ফেরেন স্মিথ। ৮৮ বলে তাঁর ব্যাট থেকে আসে ৪৪ রান। অস্ট্রেলিয়া ১২২ রানে চতুর্থ উইকেট হারায়।
তখন ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আরও স্পষ্টভাবে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তবে এরপর আর কোনো উইকেট হারাতে হয়নি অস্ট্রেলিয়াকে। ক্যামেরন গ্রিন ও অ্যালেক্স ক্যারি সতর্ক ব্যাটিংয়ে দিন শেষ করেন। গ্রিন ৪৩ এবং ক্যারি ৫০ বলে ১৯ রান করে অপরাজিত আছেন।
তৃতীয় দিন শেষে অস্ট্রেলিয়ার দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোর ৫৩ ওভারে ১৬১/৪। বাংলাদেশের হয়ে হাসান মাহমুদ ২টি, তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ ১টি করে উইকেট নিয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার সামনে এখন লক্ষ্য প্রথমে ইনিংস পরাজয় এড়ানো। এরপর ম্যাচে ফিরতে হলে আরও বড় লড়াই করতে হবে তাদের। বাংলাদেশের প্রয়োজন বাকি ছয় উইকেট। তিন দিন ধরে ম্যাচে দাপট দেখানো বাংলাদেশ এখন জয়ের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে স্মরণীয় এক টেস্ট জয়ের সম্ভাবনাও দেখছে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংস: ১৯৮
বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস: ৪২৬
তানজিদ হাসান তামিম, সেঞ্চুরি; নাজমুল হোসেন শান্ত, অর্ধশতক; মেহেদী হাসান মিরাজ ৬৫, হাসান মাহমুদ ১৪, তাইজুল ইসলাম ১৭, তাসকিন আহমেদ ১৪*, ইবাদত হোসেন ৭। জশ হ্যাজেলউড ৬/৮৯।
অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংস: ৫৩ ওভারে ১৬১/৪
স্টিভেন স্মিথ ৪৪, মার্নাস লাবুশেন ৩১, ক্যামেরন গ্রিন ৪৩*, অ্যালেক্স ক্যারি ১৯*। হাসান মাহমুদ ২/৩৩, তাইজুল ইসলাম ১/২৮, মেহেদী হাসান মিরাজ ১/২০।