কারাগারে থেকেও কীভাবে গাড়ি পোড়ানোয় জড়িত মেজর সাদিকুল, আদালতে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম | প্রকাশ: ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:১১ পিএম
কারাগারে থেকেও কীভাবে গাড়ি পোড়ানোয় জড়িত মেজর সাদিকুল, আদালতে ব্যাখ্যা দিয়েছে পুলিশ
ছবি: সংগ্রহীত

রাজধানীর ভাটারার বসুন্ধরা এলাকায় প্রাইভেটকারে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাবেক মেজর মো. সাদিকুল হক কীভাবে জড়িত হলেন, যখন ঘটনার সময় তিনি কারাগারে ছিলেন, সেই প্রশ্নের লিখিত ব্যাখ্যা আদালতে দিয়েছে ভাটারা থানা পুলিশ। পুলিশের দাবি, কারাগারে যাওয়ার আগে বিভিন্ন গোপন সভা ও প্রশিক্ষণ কর্মশালার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নির্দেশনা, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়ন করেছিলেন সাদিকুল। পরে তাঁর দেওয়া নির্দেশনা, অর্থায়ন ও মদদের অংশ হিসেবেই গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে ভাটারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাজহারুল ইসলাম ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. চাঁদ আলী লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেন। প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই কামাল হোসেন জানান, আদালত পুলিশের লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেছেন। এ বিষয়ে পরে আদেশ দেওয়া হবে।

এর আগে গত ১০ আগস্ট মামলাটিতে সাদিকুলকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদনের শুনানিতে তাঁকে আদালতে হাজির করা হয়। তখন তাঁর আইনজীবী এইচ এম আল-আমিন প্রশ্ন তোলেন, "ঘটনার সময় আসামি কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থেকে তিনি কীভাবে গাড়ি পোড়ান?" এই প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতেই আদালত ভাটারা থানার ওসি ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চান।

পুলিশের লিখিত ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, তদন্তে সাদিকুলের বিভিন্ন গোপন সভা, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালার সঙ্গে পরবর্তী সময়ে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনার যোগসূত্র পাওয়া গেছে।

ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩ থেকে ৮ জুলাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার পাশে কেবি কনভেনশন হলের দ্বিতীয় তলার হলরুমে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের নিয়ে একটি গোপন সভা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সভাটি সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। সেখানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করা, সমর্থকদের উৎসাহিত করা এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির বিষয়ে আলোচনা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

পুলিশের ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে, এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৩ জুলাই ভাটারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়। ওই মামলায় তদন্তে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় সাদিকুলকে আসামি করা হয়।

তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, সাদিকুল ওই কার্যক্রমে ‘প্রধান প্রশিক্ষক’ ও ‘কানেক্টর’ হিসেবে ভূমিকা পালন করতেন। রূপগঞ্জের পূর্বাচল সি-সেল নামের একটি রিসোর্ট, কাঁটাবনের একটি রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএস, উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর এবং আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বিপরীতে প্রিয়াংকা সিটির ২ নম্বর গেটসংলগ্ন তাঁর ফ্ল্যাটে স্ত্রী সুমাইয়া জাফরিনসহ একাধিক গোপন প্রশিক্ষণ ও ওয়ার্কশপ আয়োজনের কথাও পুলিশের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, এসব সভা ও প্রশিক্ষণে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে কেউ পরে গ্রেপ্তার হন, আবার অনেকে গ্রেপ্তার হননি। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর লক্ষ্যে দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ এসব সভা থেকে নেওয়া হয়।

পুলিশের দাবি, সাদিকুলের আগের নির্দেশনা, অর্থায়ন ও মদদের ভিত্তিতে ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই পরে বাদীর গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। এ কারণেই মামলাটিতে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য তদন্তে পাওয়া গেছে বলে ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর রাতে ভাটারা থানার বিটুমিন গেটের সামনে মনির হোসেন তাঁর প্রাইভেটকার রেখে বাসায় যান। পরে গাড়িতে আগুন লাগার খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এরপর সংবাদপত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে মনির হোসেন আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১৩ নভেম্বরের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কথা জানতে পারেন। গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ভাটারা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। মামলায় কারও নাম উল্লেখ না করে ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হয়।

পুলিশের ৭ আগস্টের আবেদনে বলা হয়, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটানো হয়। তদন্তে সাদিকুলের এ ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর সাদিকুলকে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর সামরিক আদালত তিন মাসের কারাদণ্ড দেন। এরপর তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ভাটারা থানার অপর একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।

এই অবস্থায় ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বরের গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় তাঁকে সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখাতে গত ৭ আগস্ট আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. চাঁদ আলী। সেখানেই সাদিকুলের ওই ঘটনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়।

আসামিপক্ষের আইনজীবী এইচ এম আল-আমিনের বক্তব্য, সাদিকুল ঘটনার সময় কারাগারে ছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি কীভাবে গাড়ি পোড়ানোর ঘটনায় জড়িত হতে পারেন। সেই প্রশ্নের জবাব দিতেই আদালতের নির্দেশে পুলিশ রোববার লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে