মহিলা বাস সার্ভিস উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী

নারীদের জন্য ১০০টি, মোট ২০০ ইভি বাস কিনবে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদন
| আপডেট: ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১২ এএম | প্রকাশ: ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ০৬:১২ এএম
নারীদের জন্য ১০০টি, মোট ২০০ ইভি বাস কিনবে সরকার
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। ছবি: সংগ্রহীত

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করতে ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস (ইভি বাস) কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ১০০টি বাস নারীদের জন্য রাখা হবে। তবে এসব বাস কেনার অনুমোদন, টেন্ডারসহ আন্তর্জাতিক ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অন্তত দেড় বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসি ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) আয়োজিত ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।

শেখ রবিউল আলম বলেন, ফসিল ফুয়েলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে ইভি বাসের ব্যবহার বাড়ানো হবে। ঢাকায় মাল্টিমোডাল যোগাযোগব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেও এসব বাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

মন্ত্রী জানান, সরকার সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ২০০টি ইভি বাস সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে ১০০টি বাস নারীদের জন্য রাখা হবে। প্রকল্পের মাধ্যমে বাস কেনার ক্ষেত্রে অনুমোদন, টেন্ডারসহ আন্তর্জাতিক ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। এ কারণে দ্রুত পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন চালুর লক্ষ্যেই সরাসরি ক্রয়প্রক্রিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করতে বিআরটিসি প্রাথমিকভাবে তিন শহরে ১৩টি রুটে ১৪টি ‘পিংক বাস’ চালু করেছে। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি রুটে ১০টি, চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি এবং বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি বাস পরিচালিত হবে।

ঢাকার ১০টি বাসের মধ্যে একটি একতলা এবং নয়টি দ্বিতল। চট্টগ্রামের দুটি বাসই দ্বিতল এবং বগুড়ার দুটি বাসও দ্বিতল। এই বিশেষ বাসসেবার আওতায় ঢাকা মহানগরীতে ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি এবং বগুড়ায় ১৬টি, মোট ১৩৪টি স্টপেজে নারী যাত্রীদের পরিবহনসেবা দেওয়া হবে।

নারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী বলেন, শুধু বাসের ভেতরে নয়, বাসের জন্য অপেক্ষার সময় এবং গন্তব্যে পৌঁছে বাস থেকে নামার সময়ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বাসে ওঠা-নামার সময় হয়রানি, অস্বস্তি বা অনিরাপদ পরিস্থিতি তৈরি হলে নারীদের গণপরিবহন ব্যবহারে আগ্রহ কমে যায়। তাই নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ যাতায়াত নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শুধু নারী যাত্রীদের জন্য এই বিশেষ বাসসেবা চালু করা হয়েছে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টরও নারী। নারীদের গণপরিবহনে অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি নিরাপদ ও যাত্রীবান্ধব পরিবেশ তৈরিই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

মন্ত্রী বলেন, নারীরা পরিবার, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে তাদের নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। এই বিশেষ বাসসেবা ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিআরটিসির বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন শেখ রবিউল আলম। তিনি জানান, সংস্থাটি বর্তমানে লোকসানে নেই, বরং ব্রেক-ইভেন অবস্থায় রয়েছে। তবে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা ও সেবার মান আরও উন্নত করার প্রয়োজন রয়েছে। পুরোনো ব্যবস্থাপনাকে সময়োপযোগী করার পাশাপাশি যাত্রীবান্ধব অপারেশন গড়ে তুলতে রুট পুনর্বিন্যাস ও রুট পারমিট যৌক্তিকীকরণের কাজ চলছে।

নারীদের জন্য চালু করা বাসসেবা যেন অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগের মতো কিছুদিন পর বন্ধ হয়ে না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার কথা বলেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, উদ্বোধনের পর সেবার মান আরও বাড়াতে হবে এবং প্রতিদিন ব্যবস্থাপনার উন্নতি করতে হবে। উদ্যোগটিকে টেকসই ও আরও বিস্তৃত করাই বড় চ্যালেঞ্জ।

পিংক বাসে থাকছে আধুনিক প্রযুক্তি

নারী যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সেবার মান বাড়াতে পিংক বাসে বিভিন্ন প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। বিআরটিসি জানিয়েছে, বাসগুলোতে ই-টিকিটিং ও ভেহিক্যাল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) যুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে তিনটি বাসে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা এবং একটি বাসে ওয়াই-ফাই সুবিধা চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এসব প্রযুক্তি সব বাসে সম্প্রসারণ করা হবে।

বিআরটিসি ও ‘সহজ ডটকম’-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের আওতায় মহিলা বাস সার্ভিসে ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এতে বাসে ওঠার আগে টিকিট সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হবে এবং যাত্রীদের অপেক্ষার সময় ও কাউন্টারনির্ভরতা কমবে। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করা হচ্ছে।

বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা বলেন, দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা হিসেবে বিআরটিসিকে আরও আধুনিক, যাত্রীবান্ধব ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাসসেবার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সিটি সার্ভিসে ইলেকট্রিক বাস চালুর লক্ষ্যে অর্থায়ন ও ঋণসহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

যেসব রুটে চলবে পিংক বাস

ঢাকার নতুন বাজার (কোকাকোলা) থেকে মতিঝিল রুটে কোকাকোলা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান ও মতিঝিলে বাস থামবে।

তালতলা থেকে মতিঝিল রুটে তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর ও সচিবালয় স্টপেজ রয়েছে।

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে জিপিও রুটে ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশের পুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড় (সায়েদাবাদ), ওয়ারী (বলধা গার্ডেন), গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয় ও মৎস্য ভবনে বাস থামবে।

মিরপুর-১০ থেকে মতিঝিল রুটে মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ, পল্টন ও মতিঝিল স্টপেজ রয়েছে।

মিরপুর থেকে মতিঝিল রুটে মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহবাগ, গুলিস্তান ও মতিঝিল রয়েছে।

মিরপুর-১২ থেকে মতিঝিল রুটে মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান ও মতিঝিল স্টপেজ রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার রুটে চাষাঢ়া, শিবু মার্কেট, স্টেডিয়াম, ঝালকুড়ি, ভূইগড়, সাইনবোর্ড, রায়েরবাগ, শনির আখড়া, টিকাটুলি, গুলিস্তান ও মতিঝিল স্টপেজ রয়েছে।

মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল রুটে মোহাম্মদপুর, শংকর, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল ও কমলাপুরে বাস থামবে।

আব্দুল্লাহপুর থেকে মতিঝিল রুটে আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুর্মিটোলা, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, মৎস্য ভবন, প্রেস ক্লাব, গুলিস্তান ও মতিঝিল স্টপেজ রয়েছে।

গাজীপুর থেকে বিমানবন্দর রুটে গাজীপুর শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আব্দুল্লাহপুর, আজমপুর ও বিমানবন্দর স্টপেজ রয়েছে।

বগুড়ার শেরপুর থেকে মাটিডালি রুটে আরডিএ স্কুল, নয়মাইল মোড়, শাহ উপশহর গেট, বি-ব্লক-মাঝিরা, বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ ও মাটিডালি স্টপেজ রয়েছে।

বনানী থেকে মোকামতলা স্ট্যান্ড রুটে বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি মোড়, টিএমএসএস হাসপাতাল, মহাস্থান বাজার ও মোকামতলা স্ট্যান্ডে বাস থামবে।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট থেকে পতেঙ্গা রুটে কালুরঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২ নম্বর গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেক বিল্ডিং, ফ্রিপোর্ট, কাঠগড় ও পতেঙ্গা স্টপেজ রয়েছে।

বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, নারীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। ভবিষ্যতে বাসের সংখ্যা ও রুট পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন পারভীন, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন সংস্থার প্রধান, বিআরটিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, মহিলা বাস সার্ভিসের যাত্রী ও সেবাগ্রহীতা এবং পরিবহন খাতের বিভিন্ন অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে