লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অর্থাভাব ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে এক নজিরবিহীন সংকট। শিক্ষার্থীদের বছরে তিনটি মূল্যায়ন (সাময়িক) পরীক্ষা নেওয়ার জন্য মিলছে না পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার ধারা বজায় রাখতে বাধ্য হয়ে নিজের পকেটের বেতনের টাকা খরচ করে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ছাপানো. খাতা, ফলাফল রেকর্ড কার্ড ও আনুসঙ্গিক খরচ চালাচ্ছেন প্রধান শিক্ষকেরা। প্রাথমিক শিক্ষা খাতের এই দৈন্যদশা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ। আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এই ২য় মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রাথমিকে আগের মতো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা ফি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে, বিদ্যালয়ে স্লিপ ফান্ডের যে বরাদ্দ আসে, তাও নিয়মিত পাওয়া যায় না কিংবা বরাদ্দকৃত টাকা পরীক্ষা পরিচালন খরচের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। পরীক্ষা না নিলে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন থমকে যাবে, এমন দায়বদ্ধতা থেকে অনেক প্রধান শিক্ষক হাজার হাজার টাকা ব্যক্তিগতভাবে খরচ করে পরীক্ষার উত্তরপত্র ও প্রশ্নপত্র ছাপানোর বন্দোবস্ত করছেন।
লক্ষ্মীপুর জেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহের ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের ১৮ আগষ্ট থেকে ২য় প্রান্তিক মূল্যায়ন শুরু হওয়ার সময়সূচির একটি পত্রে পরীক্ষা গ্রহন সংক্রান্ত কয়েকটি নির্দেশনাবলী দিয়েছেন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। পত্রে মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্নের জন্য শিক্ষার্থী বা অভিভাবকদের নিকট থেকে ফি গ্রহন করা যাবে না এবং বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্রসহ (খাতা) আনুষাঙ্গিক ব্যয় স্লিপ ফান্ড হতে নির্বাহ করতে হবে মর্মে নির্দেশনা দিয়েছেন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, উপজেলায় ৯৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। সব বিদ্যালয়ের জরুরী ছোট খাটো মেরামত, সৌন্দর্য বর্ধন, খেলাধুলার সামগ্রী এবং শিক্ষা উপকরণ কেনার জন্য বিদ্যালয়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বা স্লিপ ফান্ড নামে বরাদ্দ দেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনুযায়ী বরাদ্দের জন্য প্রতি বছর বাজেট দেওয়া হয়। এতে সর্বোচ্চ ৫০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে ৫০ হাজার টাকা, ৫১-৩০০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এক লক্ষ টাকা, ৩০১-৬০০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে দেড় লক্ষ টাকা, ৬০১-১০০০ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে দুই লক্ষ টাকা এবং ১০০০ এর উর্ধ্বে শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের জন্য আড়াই লক্ষ টাকা বাজেট দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রধান শিক্ষকেরা জানান, বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বাৎসরিক তিনটি মূল্যায়ন পরীক্ষা নিতে হয়। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ফটোকপি, ফলাফল রেকর্ড কার্ড, উত্তরপত্রসহ আনুষঙ্গিক কেনার জন্য প্রতি মূল্যায়নে মোটা অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু নির্ধারিত বাজেট না থাকায় শিক্ষকদের নিজেদের বেতন থেকেই এই অর্থ পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া ৫০টিরও বেশি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারি শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। তারা এসব পরীক্ষা চালাতে হিমসিম খাচ্ছে। শিক্ষকরা জানান, প্রতি বছর শিক্ষার্থী অনুযায়ী স্লিপ বরাদ্দের জন্য বাজেট দেওয়া হয়। সেই বাজেট অনুযায়ী তিনটি পরীক্ষাসহ যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করে প্রধান শিক্ষকরা। গত তিন বছর যাবত বছর শেষে মাত্র ১৫ ভাগ টাকা বরাদ্দ দেন। এর থেকে আবার ২০ ভাগ টাকা ভ্যাট কেটে নেন। প্রশ্নপত্র, ফলাফল রেকর্ড কার্ড, উত্তরপত্রসহ পরীক্ষার সংক্রান্ত আনুষঙ্গিক উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস থেকে সরবরাহের করার জন্য দাবি জানান শিক্ষকরা।
উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বছরে তিনটি মূল্যায়নের জন্য প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, ফটোকপি, উত্তরপত্র, ফলাফল রেকর্ড কার্ড তৈরীসহ আনুষঙ্গিক যে টাকা খরচ হচ্ছে তা প্রধান শিক্ষকরা নিজেদের অর্থ থেকে ব্যয় করেন। শিক্ষার্থী অনুযায়ী প্রতিটি মূল্যায়নের জন্য ১০-২০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। কিন্তু ব্যেেয়র অর্ধেক টাকাও তারা পান না।
একজন প্রধান শিক্ষক জানান, গত অর্থবছর তার বিদ্যালয়ের স্লিপের বাজেট ছিল দেড় লক্ষ টাকা। বছর শেষে (জুন মাসে) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ টাকা। এই বরাদ্দ থেকে আবার ভ্যাট বাবত কেটে নেওয়া হয়েছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ তিনটি মূল্যায়নে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৪৭ হাজার টাকা। বাকি টাকা পাওয়ার আর সুযোগ নেই বলে তিনি মনে করেন। ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের স্লিপ বাজেট বরাদ্দের প্রস্তব এখনো তারা পায়নি। অথচ আগামী ১৮ আগষ্ট থেকে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার প্রশ্নপত্র, উত্তরপত্র এবং ফলাফল রেকর্ড কার্ড প্রধান শিক্ষক হিসাবে তাকেই সরবরাহ করতে হবে।
অভিভাবকদের মতে, শিক্ষকরা নিজ থেকে আর্থিক চাপ সহ্য করছেন বলেই শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারছে, যা প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থা প্রধান শিক্ষকদের বেতনের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) আবু ইউসুফ দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই আর্থিক সংকট সমাধানের এবং পরীক্ষা পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে এই আশ্বাস বাস্তবে কবে রূপ নেবে, সেটার দিকেই এখন তাকিয়ে আছেন ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক ও অভিভাবকমহল।