লিবিয়া থেকে গ্রিস যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে দিকভ্রষ্ট হয়ে প্রায় ১০ দিন ভেসে থাকা একটি রাবারের নৌকা থেকে ২৯ বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা হয়েছে। নৌকাটিতে থাকা ৪২ জনের মধ্যে ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিকসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূল থেকে উদ্ধারের পর জীবিতদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
রোববার (১৬ আগস্ট) কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেনের সই করা চিঠিতে নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হওয়া, দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে থাকা এবং যাত্রীদের উদ্ধারের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, মানবপাচার চক্রের সহায়তায় গ্রিসে যাওয়ার উদ্দেশ্যে গত ৩ আগস্ট লিবিয়ার তবরুক থেকে রাবারের নৌকাটিতে যাত্রা করেন ৩৮ বাংলাদেশি ও চার সুদানি নাগরিক। নৌকাটি স্পিডবোটের ইঞ্জিন দিয়ে চলছিল। তবে এতে কোনো উপযুক্ত নেভিগেশন ব্যবস্থা ছিল না।
যাত্রার আগে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বলা হয়েছিল, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে গ্রিসে পৌঁছাতে প্রায় ৩৬ ঘণ্টা সময় লাগবে। কিন্তু নেভিগেশন ব্যবস্থার অভাবে একপর্যায়ে নৌকাটি দিকভ্রষ্ট হয়ে পড়ে। পরে জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে সেটি সাগরে ভাসতে থাকে।
প্রায় ১০ দিন এভাবে সাগরে ভেসে থাকার পর গত ১৩ আগস্ট নৌকাটি মিসরের মারসা মাতরুহ এলাকার উপকূলে পৌঁছায়। স্থানীয় পুলিশ তখন যাত্রীদের উদ্ধার করে। উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ১৮ জন গুরুতর অসুস্থ ও অচেতন ছিলেন। তাঁদের মারসা মাতরুহ জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পুলিশ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মোট ২৯ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। বিষয়টি জানার পর কায়রোয় বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) মো. জাকির হোসেনও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরে হাসপাতালের এক কর্মীর সহায়তায় চিকিৎসাধীন বাংলাদেশি নাগরিক আব্দুল করিমের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেন দূতাবাসের কর্মকর্তা। তাঁর কাছ থেকেই নৌকাটির যাত্রা ও সাগরে আটকে পড়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানতে পারেন তাঁরা।
আব্দুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় সাগরে ভাসমান অবস্থায় তীব্র গরম, প্রচণ্ড রোদ এবং খাবার ও পানির সংকটে যাত্রীরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় ৯ বাংলাদেশি ও এক সুদানি নাগরিক মারা যান।
আব্দুল করিম আরও জানান, দীর্ঘ সময় সাগরে অবস্থানের কারণে মৃতদেহগুলোতে পচন ধরে যায়। পরিস্থিতির একপর্যায়ে জীবিত যাত্রীরা মৃতদেহগুলো সমুদ্রে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হন।
ঘটনাটি জানার পর থেকে মিশরে বাংলাদেশ দূতাবাস স্থানীয় পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের শারীরিক অবস্থার বিষয়ে দূতাবাস সার্বক্ষণিক খোঁজখবর নিচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় কনস্যুলার ও অন্যান্য সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দূতাবাস জানিয়েছে, চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিরা সুস্থ হয়ে উঠলে মিসরের প্রচলিত আইন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে তাঁদের দ্রুত বাংলাদেশে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য, চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের বক্তব্য এবং সরেজমিন সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন পরবর্তীতে পাঠানো হবে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ দূতাবাস।