সন্তানের সাফল্যে বাবা-মায়ের মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটে ওঠে, তার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তাদের মানবিক মূল্যবোধ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই যেন নীলফামারীর সৈয়দপুর মুন্সিপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মো. আক্তার হোসেন ফেকুর জীবনের অন্যতম বড় অর্জন।
সৈয়দপুর পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক শ্রেষ্ঠ কাউন্সিলর, সমাজসেবক ও ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন ফেকু নিজেকে গড়ে তুলেছেন কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে। তাঁর বাবা মো. ভোলা আনসারী বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মচারী ছিলেন। তিনি বর্তমানে প্রয়াত।
ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হন আক্তার হোসেন ফেকু। নিজের ব্যবসার আয় দিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সাধ্যমতো সহযোগিতা করে এলাকায় একজন সমাজহিতৈষী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
পরবর্তীতে এলাকার মানুষের অনুরোধ ও ভালোবাসায় তিনি সৈয়দপুর পৌরসভার কাউন্সিলর নির্বাচনে অংশ নেন। বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে মানুষের সেবা করার সুযোগ পান। দায়িত্ব পালনকালে সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ড ও জনকল্যাণে ভূমিকার জন্য তৎকালীন সৈয়দপুর পৌর মেয়র আমজাদ হোসেন সরকার তাঁকে ‘শ্রেষ্ঠ কাউন্সিলর’ হিসেবে সম্মানিত করেন।
তবে আক্তার হোসেন ফেকুর সবচেয়ে বড় পরিচয় যেন তাঁর চার সন্তান। শিক্ষাজীবন, পেশা, ব্যবসা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে চার সন্তানই নিজেদের আলাদা পরিচয় তৈরি করছেন।
আক্তার হোসেন ফেকুর বড় ছেলে মো. আসিফ হোসেন, দিনাজপুর সরকারি কলেজ থেকে হিসাব বিঞ্জান বিষয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন। পরে বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ইঅটঝঞ), সৈয়দপুর থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন।
দ্বিতীয় ছেলে মো. আলী হায়দার আরিফ, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সৈয়দপুর থেকে ইংরেজি বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে অনার্স সম্পন্ন করেন। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন এবং সেখানেও প্রথম শ্রেণির ফলাফল অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি অনলাইন ও অফলাইন কোর্সে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।
তৃতীয় ছেলে মো. আরজু হোসেন, সৈয়দপুর সরকারি কলেজে সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স পড়ছেন। বর্তমানে তিনি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে নিজেকে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলছেন। চতুর্থ ছেলে মো. আলী হোসেন আকিব, বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, সৈয়দপুরে হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স পড়ছেন। বর্তমানে শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন।
চার ভাইয়ের প্রত্যেকের পথ কিছুটা ভিন্ন হলেও লক্ষ্য যেন একই-শিক্ষার মাধ্যমে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করা এবং পাশাপাশি মানুষের জন্য কাজ করা। আক্তার হোসেন ফেকুর পরিবারে শিক্ষা ও ব্যবসাকে পরস্পরের পরিপূরক হিসেবে দেখা হয়। সন্তানরা পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ত রেখেছেন। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে দূরে রাখতে এলাকায় সচেতনতা তৈরির কাজেও তারা ভূমিকা রাখছেন।
স্থানীয়দের মতে, একজন বাবার প্রকৃত সাফল্য শুধু সম্পদ গড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তাঁর সন্তানরা কতটা শিক্ষিত, সৎ, কর্মঠ ও মানবিক মানুষ হয়ে উঠেছে-সেখানেই সেই সাফল্যের বড় পরিচয়। সেই বিচারে আক্তার হোসেন ফেকু যেন একজন সফল ও গর্বিত বাবা।
ব্যবসা থেকে উঠে এসে সমাজসেবা, জনপ্রতিনিধিত্ব এবং সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় প্রতিষ্ঠিত করার দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া আক্তার হোসেন ফেকুর গল্প তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি পরিশ্রম, শিক্ষা, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতারও গল্প।
চার সন্তানের মা শাম্মা পারভীন একজন গর্বিত মা। তিনি সন্তানের লেখাপড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ী স্বামীকে সব সময় পরামর্শ দিতেন। স্বামীর পাশে থেকে সন্তানদের অনেকটা আগলে রেখে মানুষের মত মানুষ করেছেন। সৈয়দপুরের মুন্সিপাড়ার এই পরিবারটি প্রমাণ করছে-সন্তানদের হাতে শুধু অর্থ-সম্পদ তুলে দেওয়াই উত্তরাধিকার নয়; তাদের হাতে শিক্ষা, নৈতিকতা, কর্মসংস্কৃতি ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তুলে দেওয়াও একজন বাবার সবচেয়ে বড় অর্জন।