হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের সুযোগ নেই: চিফ প্রসিকিউটর

নিজস্ব প্রতিবেদন | প্রকাশ: ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
হাসিনাসহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের আপিলের সুযোগ নেই: চিফ প্রসিকিউটর
ছবি: সংগ্রহীত

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাসহ যেসব আসামি রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করেননি, তাদের আর আপিল করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে গেলে আইনে আর আপিল গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। পলাতক কিংবা কারাগারে থাকা, উভয় ধরনের আসামির ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীতে গুম ও মানবাধিকার আইন নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১(৩) ধারায় রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আপিল না করলে পরে সেটি আর গ্রহণযোগ্য হবে না।

তিনি বলেন, “সেটা যে কারো আপিলই হোক, সেটা হোক শেখ হাসিনার, সেটা হোক মাওলানা আবুল কালাম আজাদের, অর্থাৎ যে কোনো পলাতক আসামি অথবা যারা জেলে আছে, তাকে অবশ্যই আপিলটা ফাইল করতে হবে ৩০ দিনের মধ্যে।”

আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, কোনো আসামি পলাতক থাকার কারণে বা অন্য কোনো কারণে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে না পারলে পরে তার পক্ষে আর আপিল দায়েরের সুযোগ থাকবে না।

মাওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল। দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থাকার কারণে তিনি আপিল করেননি। তার আপিল আদালত এখনো গ্রহণ করেনি, ফলে এ বিষয়ে বর্তমানে কোনো বিচারিক কার্যক্রমও চলমান নেই।

সাজা স্থগিতের বিষয়ে সরকারের ক্ষমতা প্রসঙ্গে আমিনুল ইসলাম বলেন, ৩০ দিনের সময়সীমা পার হয়ে গেলে রায় বাস্তবায়ন ছাড়া বিকল্প থাকে না। তবে সাজা স্থগিত করা সরকারের একটি নিজস্ব ক্ষমতা। সরকার চাইলে কারও ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে, আবার নাও করতে পারে।

জুলাই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শেখ হাসিনাসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং সম্পদ বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর। সম্পদ বাজেয়াপ্তের বিষয়ে তিনি বলেন, আইন ও বিধিতে এ ধরনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

তবে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া সাধারণ আইনে নির্ধারিত বলে জানান তিনি। এ বিষয়ে শুনানির সময় ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের কাছেও সুস্পষ্ট নির্দেশনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছিলেন বলে জানান আমিনুল ইসলাম।

তিনি বলেন, প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত হলে এর রেট্রোস্পেকটিভ ইফেক্ট থাকবে। অর্থাৎ আগে দেওয়া রায়ের ভিত্তিতেও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা সম্ভব হবে। এতে আইনগত কোনো সমস্যা হবে না বলেও জানান তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে নতুন পাস হওয়া ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’ নিয়েও কথা বলেন চিফ প্রসিকিউটর। তিনি আইনটিকে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, নতুন আইনের ফলে গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাদের স্বজনদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আরও সহজ হবে।

তিনি জানান, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আইনটি সংশোধিত আকারে পাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৬’ পাস হয়েছে।

নতুন আইনের আওতায় গুমের সংজ্ঞা নিয়েও ব্যাখ্যা দেন আমিনুল ইসলাম। তিনি বলেন, কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাউকে আটক করার পর ২৪ ঘণ্টার বেশি সময় অজ্ঞাত স্থানে গোপন রাখে এবং তাকে আইনি সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে, তাহলে সেটি গুম হিসেবে বিবেচিত হবে।

আর কোনো গুমের ঘটনা যদি ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়, তাহলে সেটিকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা যাবে বলে জানান তিনি।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাধারণ আদালতে কোনো গুমের মামলার বিচার চলার সময় যদি মনে হয় ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা প্রয়োজন, তাহলে সংশ্লিষ্ট আদালত মামলাটি ট্রাইব্যুনালে পাঠাতে পারবে।

ট্রাইব্যুনালে জমা হওয়া গুমের অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই করা হবে বলেও জানান তিনি। তার ভাষায়, “গুমসংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগ ও তদন্ত প্রতিবেদন যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হবে। এরপর আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”

এ সময় প্রস্তাবিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মধ্যে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হবে না বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে