সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমিলা জামানের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা ও সম্পত্তির রেকর্ড পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তাদের কথিত অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদন বা মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্টের (এমএলএআর) জবাবে এসব নথি পাঠানো হয়েছে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। দুদকের মানিলন্ডারিং-২ শাখার নথি অনুযায়ী, সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও রুকমিলা জামানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো এমএলএআর দেশটির সেন্ট্রাল অথরিটি এবং অফিস অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (ওআইএ) ২০২৫ সালের ১৯ মে গ্রহণ করে।
ওই আবেদনে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের ব্যাংক হিসাব, ব্যবসা ও সম্পত্তির বিস্তারিত রেকর্ড চাওয়া হয়েছিল। পাশাপাশি কথিত অপরাধলব্ধ সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতাও চাওয়া হয়।
দুদকের নথি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই) তদন্তসংক্রান্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির রেকর্ড পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘FBI FD-302 Report of Investigation’ এবং ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সম্পত্তির রেকর্ড। এসব নথি একটি সিডিতে সংযুক্ত করে দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে এমএলআরে চাওয়া অন্যান্য রেকর্ড ও তথ্যের বিষয়ে পরবর্তী সময়ে জবাব দেওয়া হবে বলে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দুদককে জানিয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ ও বাজেয়াপ্তের বিষয়ে পৃথক চিঠিতে সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলেও দুদকের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাওয়া রেকর্ডপত্রের মূল কপি পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছে দুদক।
এদিকে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
দুদকের সংশ্লিষ্ট টিম ওই বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির সঙ্গে জড়িত থাকার পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্যসচিব এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধানের সুপারিশ করেছে। তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানটি আদানি পাওয়ার ও বাংলাদেশ সরকারের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
দুদকের সোমবারের বিজ্ঞপ্তিতে আরও কয়েকটি দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে নেওয়া পদক্ষেপের তথ্য জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ফেনী-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আলিউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিমের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে জমি দখল, নিয়োগ ও দলীয় পদ বাণিজ্য এবং অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগ রয়েছে। তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগটি দুদকের নোয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে তদন্তাধীন একটি মামলার সঙ্গে যুক্ত করে তদন্তের সুপারিশ করা হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ওয়াকিটকি কেনায় বড় ধরনের অনিয়ম ও সরকারি অর্থ অপচয়ের অভিযোগেও নতুন করে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুদক। এ জন্য অনুসন্ধানকারী ও তদারককারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ওয়াকিটকি সরবরাহের কাজ দেওয়া হয় এবং প্রতিষ্ঠানটি একটি চীনা কোম্পানির সনদ ব্যবহার করে। সরকারি অন্য সংস্থার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দামে ওয়াকিটকি কেনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মচারীদের ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার অসৎ উদ্দেশ্যের অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে বিশেষ এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালানো হয়েছিল।
অর্থ পাচার প্রতিরোধে আরেকটি অগ্রগতির কথাও জানিয়েছে দুদক। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার, নাসরিন ইসলাম এবং ওয়ান প্রোপার্টি লিমিটেডের বিষয়ে আইল অব ম্যানের কাছে পাঠানো পারস্পরিক আইনি সহায়তার আবেদনের সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। আইল অব ম্যান কর্তৃপক্ষ দুদকের আবেদন বাস্তবায়ন করে অভিযোগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সেখানে থাকা সব সম্পত্তি ফ্রিজ বা অবরুদ্ধ করার বিষয়টি কমিশনকে নিশ্চিত করেছে।