কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হলো তার পরিবারের অপেক্ষা। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) সকালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে প্রথম জানাজা শেষে নিজ বাড়িতে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কোটবাড়ি গন্ধমতি বড় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সকাল ১০টা ১০ মিনিটে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে অপ্রতিমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। শেষবারের মতো অপ্রতিমকে এক নজর দেখতে সেখানে হাজারো মানুষের ভিড় জমে।
জানাজার আগে বক্তব্য দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। তিনি বলেন, “অপ্রতিম আপনাদের স্নেহ ভালোবাসায় বেড়ে উঠেছে। সে যদি কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকে, তাকে ক্ষমা করে দেবেন।” কথা বলার সময় বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তার কান্নায় উপস্থিত অনেকের চোখেও পানি চলে আসে।
অপ্রতিম কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় সে। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি।
সন্ধ্যার পর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেন। পরে অপ্রতিমের বাবা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। নিখোঁজের পর তাকে খুঁজতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে।
শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর তার সন্ধান মেলে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে তুহিন নামে এক কিশোরকে আটক করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানিয়েছে। তাদের মধ্যে আনাস ও ফাহিম আহমেদের নাম বিভিন্ন সূত্রে এসেছে।
অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ। একটি সিসিটিভি ফুটেজে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে অপ্রতিমের সঙ্গে এক কিশোরকে দেখা যায়। পরে ওই কিশোরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
অপ্রতিম হত্যার ঘটনায় শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় মামলা করেন তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলায় আসামিদের নাম অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রোববার সকালে অপ্রতিমের মরদেহ তার কোটবাড়ির গন্ধমতি এলাকার বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে স্বজন ও পরিচিতজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। সকাল পৌনে ১০টার দিকে লাশবাহী গাড়িতে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে।
প্রথম জানাজা শেষে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় গন্ধমতি এলাকায়। সেখানে দ্বিতীয় জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
অপ্রতিমের মৃত্যুর ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই এই কিশোর হত্যার দ্রুত বিচার দাবি করেন।
এদিকে রোববার সকালে কুমিল্লা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের নেতৃত্বে স্থানীয় নেতারা অপ্রতিমের বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেন। এ সময় কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমিরের মুঠোফোনে অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তিনি শোকাহত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।