দোকান ছিল, ব্যবসাও ভাল চলছিল। এরমধ্যে বাজার আধুনিকায়নের নামে সেই দোকানঘর ভেঙে দেওয়া হলো। বলা হয়েছিল, নতুন মার্কেট নির্মাণ হলে আগের ব্যবসায়ীদেরই দোকান বরাদ্দ দেওয়া হবে। কিন্তু মার্কেট নির্মাণের পর পেরিয়ে গেছে বছরের পর বছর। কেউ আট বছর, কেউ সাত বছর, আবার কেউ দুই বছর ধরে নতুন দোকানের অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন, কেউ ঋণের বোঝা টানছেন। রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার তিনটি বড় হাট-বাজার নন্দনগাছী, চৌমুহনী ও বাঁকড়ার চিত্র এমনই। এসব বাজারের উন্নয়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়েছে কোটি কোটি টাকার মার্কেট। কোথাও নির্মাণ শেষে দীর্ঘদিন ধরে মার্কেট পড়ে আছে, কোথাও উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরের পরও দোকান বরাদ্দ হয়নি।
আবার নন্দনগাছীতে মার্কেটটি এখনো উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তরই হয়নি। এর মধ্যেই দোকান বরাদ্দের নামে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাজার কমিটির বিরুদ্ধে। ফলে একদিকে দোকান হারিয়ে ব্যবসায়ীরা পড়েছেন বিপাকে, অন্যদিকে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত সরকারি স্থাপনা পড়ে থাকায় কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। একই সঙ্গে বাজার থেকে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্বও কমছে।
সাত বছরেও দোকান ফেরত পাননি ৮২ ব্যবসায়ী
চারঘাট উপজেলার সবচেয়ে বড় হাট নন্দনগাছী। উপজেলার একমাত্র পশুর হাটও এটি। গত বছর প্রায় ৮০ লাখ টাকায় হাটটি ইজারা দেওয়া হয়। প্রতিবছর বিপুল রাজস্ব আদায় হলেও দীর্ঘদিন এই হাটে সরকারি উদ্যোগে কোনো মার্কেট নির্মাণ করা হয়নি। উপজেলা প্রকৌশল অফিস সূত্রে জানা যায়, নন্দনগাছী হাট আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে দোতলা মার্কেট নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর নির্মাণকাজ শুরুর কথা ছিল এবং ২০২১ সালের ১০ মার্চের মধ্যে কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়। ২০২০ সালের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। তবে মার্কেট নির্মাণের আগেই ২০১৯ সালের শুরুর দিকে পুরোনো দোকানঘরগুলো ভেঙে জায়গা খালি করা হয়। এতে ৮২ জন ব্যবসায়ী তাঁদের দোকান হারান। এক বছরের মধ্যে নতুন দোকান বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে জানান ব্যবসায়ীরা। কিন্তু সাত বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁরা দোকান বুঝে পাননি।
দোকান বরাদ্দে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এলজিইডির পক্ষ থেকে উপজেলা প্রশাসনের কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়নি। কিন্তু ২০১৯ সালে মার্কেট নির্মাণ শুরুর সময় দোকান বরাদ্দের কথা বলে তৎকালীন বাজার কমিটির সভাপতি রেজাউল করিম ও ইউনিয়ন আ'লীগের সাধারণ সম্পাদক জুলহাস ইসলাম লিটন অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেন।
সম্প্রতি বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল খালেক ও সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম মজনু ৩০ থেকে ৩৫ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দোকান বরাদ্দের নামে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা করে নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ীরা। নন্দনগাছী হাটের লবণ ব্যবসায়ী জামিরুল ইসলাম বলেন, ‘মার্কেট নির্মাণের শুরুতে আওয়ামী লীগের নেতাদের টাকা দিয়েছি। মাস দুয়েক আগে আবার বর্তমান সভাপতি আব্দুল খালেক ও সাধারণ সম্পাদক মজনুকে তিন লাখ টাকা দিয়েছি। এখনো দোকান বরাদ্দ পাইনি।’ সিট-কাপড় ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সাত বছর ধরে দোকান বন্ধ থাকায় অনেকে ব্যবসা বন্ধ করে ঢাকায় কাজ করছেন। আমি দুই দফায় ঋণ করে টাকা দিয়েও এখনো দোকান বুঝে পাইনি।’
তবে অভিযোগের বিষয়ে বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম মজনু তা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় পক্ষে-বিপক্ষে লোক থাকে। এখানে একটি পক্ষ আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি।’ ব্যবসায়ীদের আরো অভিযোগ, বর্তমান বাজার কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক কোনো নির্বাচন ছাড়াই দায়িত্বে রয়েছেন। সভাপতি আব্দুল খালেক একটি কলেজের অফিস সহকারী এবং সাধারণ সম্পাদক মফিজুল ইসলাম মজনু একজন স্কুলশিক্ষক।
আট বছরেও চালু হয়নি চৌমুহনী মার্কেট
নন্দনগাছীর মতো চৌমুহনী বাজারেও দীর্ঘদিন ধরে পড়ে আছে সরকারি মার্কেট। উপজেলার ইউসুফপুর ইউনিয়নের এই বাজারের উন্নয়নে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৬ সালের নভেম্বরে মার্কেট নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ২০১৮ সালে নির্মাণকাজ শেষ হলে মার্কেটটি উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় আট বছর। কিন্তু এখনো দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। মার্কেট নির্মাণের সময় বাজারের ১৫ ব্যবসায়ীর দোকান ভেঙে ফেলা হয়েছিল। নতুন মার্কেটে তাঁদের দোকান দেওয়ার কথা থাকলেও দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তাঁরা তা পাননি। চৌমুহনী বাজারের ব্যবসায়ী মোক্তার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দোকান বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতারা অনেকের কাছ থেকে টাকাও নিয়েছিল। কিন্তু দোকান বরাদ্দ হয়নি। এখনো হচ্ছে না। সরকারি সম্পদ পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, আর আমরা ব্যবসা করতে না পেরে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছি।’ চৌমুহনী বাজার কমিটির সভাপতি জাহিদুল করিম বলেন, ‘দোকান বরাদ্দের নামে কেউ টাকা নিয়েছে কিনা আমার জানা নেই। নানা কারণে বারবার উদ্যোগ নিয়েও মার্কেট চালু হয়নি। চেষ্টা চলমান আছে।’
দুই বছরেও বরাদ্দ হয়নি বাঁকড়ায়
উপজেলার ভায়ালক্ষ্ণীপুর ইউনিয়নের বাঁকড়া বাজারেও একই চিত্র। প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালে মার্কেট নির্মাণ করা হয়। ২০২৪ সালের মে মাসে এলজিইডি মার্কেটটি উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও দোকান বরাদ্দ হয়নি। বাজারের পুরোনো ব্যবসায়ীদের অনেকের দোকান ভেঙেই নতুন মার্কেট নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু নতুন মার্কেটে তাঁদের জায়গা না পাওয়ায় তাঁরা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। বাঁকড়া বাজারের ব্যবসায়ী বাচ্চু আলী বলেন, ‘আমার দুটি দোকান সেখানে ছিল। আমার মতো আরও অনেকের দোকান ভেঙে মার্কেট করা হয়েছে। কিন্তু এখন আর দোকান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে না। দোকানের জন্য আবেদন করে রেখেছি। দিনের পর দিন ঘুরেও দোকান পাচ্ছি না।’ বাঁকড়া বাজার কমিটির সভাপতি শামীম রানা সুমন বলেন, ‘আমিও গত এক বছর ধরে দোকান বরাদ্দ করানোর জন্য ঘুরছি। ব্যবসায়ীরা বারবার আমার কাছে আসছেন। উপজেলা প্রশাসনকে বিষয়টি জানিয়েছি।’
দায়িত্ব প্রশাসনের, অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা
তিন বাজারের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ ও দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, ‘বাঁকড়া বাজারের মার্কেট বছরখানেক আগে এবং চৌমুহনী বাজারের মার্কেট পাঁচ বছরের বেশি সময় আগে উপজেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নন্দনগাছী মার্কেটও অল্প সময়ের মধ্যে হস্তান্তর করা হবে। দোকান বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন তদারকি করে।’ চারঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘নন্দনগাছী বাজারের মার্কেট বুঝে পেলে নিয়ম অনুযায়ী ঘর বরাদ্দ করা হবে। কারও অনিয়ম করার সুযোগ নেই। বাঁকড়া ও চৌমুহনী বাজারের মার্কেটও বরাদ্দ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হবে।’