কৃষকের ঘরে প্রদীপের আলো, সহকারী সিভিল জজ হলেন শেখ আসিফ

এফএনএস (মোঃ মুজিবুর রহমান; পাটকেলঘাটা, সাতক্ষীরা) : | প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৩:৪০ পিএম
কৃষকের ঘরে প্রদীপের আলো, সহকারী সিভিল জজ হলেন শেখ আসিফ

ভোর না হতেই যে হাত দুটো লাঙলের মুঠো শক্ত করে ধরে কিংবা কাদা-মাটিতে জীবনের ঘাম ঝরায়, সেই হাতের মূল শক্তি ছিল একটিই স্বপ্ন-সন্তানকে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে হবে। অক্ষরজ্ঞানের সীমা খুব বেশি দূর না থাকলেও, সন্তানের শিক্ষার আলো জ্বালিয়ে রাখার মেধা ও সাহসে কোনো কমতি ছিল না তাঁদের। অবশেষে সেই দীর্ঘ লড়াই, অদম্য ত্যাগ আর মা-বাবার অজস্র প্রার্থনার ফল মিলল। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় সহকারী সিভিল জজ পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে পরিবারের সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছেন প্রত্যন্ত গ্রামের সন্তান শেখ আসিফ হোসেন। সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার পাটকেলঘাটা থানার প্রত্যন্ত গ্রাম বড় কাশিপুর। এই নিভৃত পল্লীর সন্তান আসিফ। বাবা শেখ জিল্লুর রহমান পেশায় একজন সাধারণ কৃষক, আর মা ফরিদা খাতুন গৃহিণী। সংসারের নিত্যদিনের টানাটানি আর সীমাবদ্ধতার মাঝেও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার প্রশ্নে কখনো আপস করেননি এই দম্পতি। অভাবের দিনগুলোতেও সন্তানের বই-খাতার অভাব হতে দেননি তাঁরা। বাবা-মায়ের এই নিরলস পরিশ্রম আর চোখের ভালোবাসাই আসিফের পথচলার প্রধান জ্বালানি হয়ে কাজ করেছে। শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই আসিফ ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। গ্রামের কাশিপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক (এসএসসি) শেষ করার পর ভর্তি হন পাটকেলঘাটা হারুণ-অর-রশিদ মহাবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) পাশ করে নিজের লক্ষ্য স্থির করেন আইন অঙ্গনে। পরবর্তীতে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে এলএলবি ও এলএলএম ডিগ্রিতে অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেন তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে বিচারক হওয়ার কঠিন লড়াইয়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করেন আসিফ। রাতদিন এক করে করা সেই তপস্যার ফল মিলল ১৮তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলে। আইন পেশার সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদে নিজের নাম লেখানোর খবরটি যখন গ্রামে পৌঁছায়, তখন তা আর কেবল একটি পরিবারের আনন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; পুরো বড় কাশিপুর গ্রাম জুড়ে নেমে আসে উৎসবের আমেজ। শিক্ষক, সহপাঠী, বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের বাঁধভাঙা শুভেচ্ছায় ভাসছেন আসিফ ও তাঁর পরিবার। এমন অভাবনীয় সাফল্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পরম করুণাময়ের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন শেখ আসিফ হোসেন। তিনি বলেন, “আমার এই অর্জন একা আমার নয়। বাবা-মায়ের হাড়ভাঙা খাটুনি, মা-বাবার ত্যাগ, শিক্ষকবৃন্দের পথপ্রদর্শন এবং বন্ধুবান্ধব ও গ্রামবাসীর দোয়ার ফসল এটি। আমি যেন আজীবন সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে বিচারকার্য পরিচালনা করে মানুষের সেবা করতে পারি-সবাই আমার জন্য এই প্রার্থনাই করবেন।”

এক কৃষক পিতার ঘামে ভেজা শক্ত হাত আর গৃহিণী মায়ের নিরবচ্ছিন্ন কষ্টের গল্প আজ রূপ নিয়েছে এক অনন্য জয়ের মহাকাব্যে। সন্তানের এই জয়ে মা-বাবার চোখের কোণে জমে থাকা আনন্দ অশ্রুই জানান দিচ্ছে-ভালোবাসা আর ত্যাগ দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার লড়াই কখনো বৃথা যায় না। আসিফের এই শুভযাত্রা দেশের হাজারো সাধারণ পরিবারের স্বপ্নবাজ তরুণদের জন্য এক নতুন আশার আলো হয়ে থাকবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে