তিন প্রজন্মের হাতেখড়ি একই শিক্ষকের কাছে, প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুসহ সকল বয়সের মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘রমণী স্যার’ নামে। মন্দির আঙ্গিনায় একটি টিনের একচালা ঘরে নেই কোনো আধুনিক শ্রেণিকক্ষ, নেই চেয়ার-টেবিল, বেঞ্চ কিংবা কোন বেতনভুক্ত শিক্ষক। পায়নি সরকারি কোনো অনুদানও।
অথচ প্রতিদিন সেখানে বসে ৬০ বছর ধরে বিনামূল্যে জ্ঞানের আলো ছড়াচ্ছেন একজন মানুষ। বয়সের ভারে শরীর নুজ্য হলেও শিক্ষাদানের নেশায় এখনো ক্লান্ত হননি তিনি।
প্রায় ছয় দশক ধরে প্রত্যন্ত গ্রামের শিশুদের বিনা পয়সায় পাঠদান করিয়ে আসছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের রাংতা গ্রামের রমণী কান্ত ব্যাপারী। দীর্ঘদিন পরে হলেও শিক্ষা ক্ষেত্রে তার এই অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার।
সোমবার দুপুরে ঢাকার আব্দুল গনি রোডের ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগৈলঝাড়া উপজেলার অজপাড়া গাঁয়ের পাঠশালার শিক্ষক রমণী কান্ত ব্যাপারীর গলায় মেডেল পরিয়ে দিয়েছেন। একইসাথে প্রধানমন্ত্রী নগদ দুই লাখ টাকার চেকসহ শিক্ষক রমণী কান্তর হাতে সম্মাননা সনদ তুলে দিয়েছেন। এসময় তার সাথে ছিলেন নাতী তরুন ব্যাপারী।
রাংতা গ্রামের রাখাল বেপারীর ছেলে রমণী কান্ত ব্যাপারী স্কুলের ছাত্র থাকাবস্থায় এলাকার গরিব পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের পড়ানো শুরু করাতেন। সালটা ছিল স্বাধীনতারও আগে। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের পড়ানোর সেই যে শুরু, বয়স বেড়ে ৭০ পেরিয়ে গেলেও আজও তা আর থামেনি। সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে শিক্ষাব্যবস্থা, বদলে গেছে গ্রামের জীবন যাত্রার মান। এসেছে আধুনিক স্কুলসহ প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা। কিন্তু রাংতা গ্রামের এই ছোট্ট পাঠশালায় এখনো প্রতিদিন শোনা যায় শিশুদের পড়াশোনার আওয়াজ।
১৯৭৩ সালে চাঁদশী ঈশ্বর চন্দ্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক (এসএসসি) পাস করার পর ভর্তি হন সরকারি গৌরনদী কলেজে। কিন্তু নিজের পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেড়োতে পারেনি রমণী কান্ত। তবে মেধাবী হওয়ায় সে সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ পেয়েও তিনি তা গ্রহণ করেনি।
গ্রামের ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের প্রতি মায়া আর ভালোবাসার কারণে চাকরিতে না গিয়ে সিদ্ধান্ত নেন তাদের পড়ানোর। এরপর কেটে গেছে একে একে প্রায় ছয় দশক। রাজিহার-চাঁদশী সড়কের পাশে রাংতা সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের আঙিনাই হয়ে উঠেছে তার পাঠশালা। পরবর্তীতে স্থানীয়দের মাঝে রমণীকান্তের পাঠশালা নামেই পরিচিত পায়। সপ্তাহে শুক্রবার বাদে প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সেখানে চলে শিশুদের পাঠদান। বর্তমানে ওই পাঠশারায় ২৫ জন শিশু শিক্ষার্থী নিয়মিত তার কাছে পড়ালেখা করছে।
পাঠশালা থেকে পড়াশোনা শেষে রমনী কান্ত ব্যাপারি নিজে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পৌঁছে দেন পার্শ্ববর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এই দীর্ঘ সময়ে তার কাছ থেকে পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এলাকার অসংখ্য শিক্ষার্থী। কেউ দেশের বিভিন্নস্থানে চাকরি করছেন, অনেকে সরকারি-বেসরকারি বড় বড় পদে দায়িত্ব পালন করছেন। সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, একই পরিবারের তিন প্রজন্মের হাতেখড়িও নিয়েছে তার কাছে থেকে।
যে বাবার হাত ধরে একদিন শিশু অবস্থায় রমণী স্যারের কাছে পড়তে এসেছিলেন, সেই বাবার সন্তানও পরবর্তীতে তার কাছেই পড়েছেন এই পাঠশালায়।
এখন সেই পরিবারের নাতি-নাতনীও তার কাছেই নিচ্ছেন হাতেখড়ি। রমণী কান্ত ব্যাপারীর পাঠশালায় নেই কোনো মাসিক বেতন। শিক্ষার বিনিময়ে তিনি চান না অর্থ। গ্রামের দরিদ্র পরিবারের সন্তানরা যাতে অর্থের অভাবে পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই বছরের পর বছর ধরে তিনি শিশুদের পড়িয়ে যাচ্ছেন। তবে অনেক অভিভাবক মাঝে মধ্যে খুশি হয়ে কিছু দিলে তা গ্রহণ করেন রমনী কান্ত ব্যাপারী।
তার নিজের জীবনও খুবই সাদামাটা। স্ত্রী রুম্পাকে নিয়ে সংসার, বাড়িতে একটি দোচালা টিনের ঘরেই তাদের বসবাস। একমাত্র ছেলে তাপস ব্যাপারী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। নিজের কিছু কৃষিজমি রয়েছে। সরকারি তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতা না পেলেও তার নামে রয়েছে বয়স্ক ভাতার কার্ড। অভাব অনটনের এই দীর্ঘ জীবনের মধ্যেও শিশুদের পড়ানোর আনন্দই যেন তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ও সাফল্য।
রমণী কান্ত ব্যাপারী বলেন, স্বাধীনতার আগে থেকেই এখানে বসে এলাকার ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করিয়ে আসছি। যতোদিন বেঁচে আছি, ততদিন যেন এভাবেই এলাকার শিশুদের কিছু শিক্ষা দিয়ে যেতে পারি। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমাকে যে সম্মান ও সম্মাননা দিয়েছেন-এতে আমার শিক্ষক জীবন স্বার্থক। বাকি জীবন মন্দির আঙ্গিনায় শিশু শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান করেই কাটাবো।