প্রতিবাদ পিটিআইয়ের

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশ: ১১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি
ছবি: সংগ্রহীত

পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ফেডারেল মন্ত্রিসভার সুপারিশ অনুমোদন করার পর এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়। প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রাদেশিক সরকারের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে খাইবার পাখতুনখাওয়ার নতুন মুখ্য সচিব হিসেবে ড. মুহাম্মদ ফখর আলম ইরফানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

ডনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সভাপতিত্বে ফেডারেল মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে প্রদেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। বৈঠকে সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে প্রাদেশিক সরকারের ‘ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় প্রেসিডেন্টকে সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করে জরুরি অবস্থা জারির পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

প্রেসিডেন্ট হাউসের বিবৃতি অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা জারির জন্য সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদ এবং গভর্নরের শাসনের জন্য ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের পর খাইবার পাখতুনখাওয়ার মুখ্য সচিব হিসেবে ড. মুহাম্মদ ফখর আলম ইরফানকে নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর নিয়োগ কার্যকর হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

পাকিস্তান প্রশাসনিক সার্ভিসের গ্রেড-২২ কর্মকর্তা ইরফান এর আগে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পাওয়ার ডিভিশনের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বাড়ি খাইবার পাখতুনখাওয়ার মারদান এলাকায়।

এ ছাড়া মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখুনজাদাকে খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালনের জন্য পদায়ন করা হয়েছে। গ্রেড-২০ কর্মকর্তা আখুনজাদা এর আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অতিরিক্ত সচিব হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি চরসাদ্দার বাসিন্দা। উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে অতিরিক্ত রাজনৈতিক এজেন্টসহ প্রদেশটির স্বাস্থ্য, তথ্য ও শিক্ষা বিভাগ এবং ডেরা ইসমাইল খানের কমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

পাকিস্তানের সংবিধানের ২৩২ অনুচ্ছেদে জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিধান রয়েছে। যুদ্ধ, বহিঃআক্রমণ কিংবা প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়া অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে দেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে প্রেসিডেন্ট জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারেন।

তবে প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার ভিত্তিতে এ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রাদেশিক পরিষদের প্রস্তাবের বিষয়টি সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে। জরুরি অবস্থার সময় প্রদেশের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সংসদের হাতে যেতে পারে। তবে প্রাদেশিক পরিষদের সাংবিধানিক ক্ষমতা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

অন্যদিকে, সংবিধানের ২৩৪ অনুচ্ছেদে প্রদেশে সাংবিধানিক ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে গভর্নরের শাসন জারির বিধান রয়েছে। এ ধারার অধীনে জারি করা ঘোষণা দুই মাসের মধ্যে সংসদের যৌথ অধিবেশনে অনুমোদন না পেলে কার্যকারিতা হারায়। অনুমোদনের মাধ্যমে এর মেয়াদ বাড়ানো গেলেও গভর্নরের শাসন কোনো অবস্থাতেই ছয় মাসের বেশি বহাল রাখা যায় না।

ডনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থার সময় নির্দিষ্ট মৌলিক অধিকার স্থগিত করার ক্ষমতা নিয়ে সংবিধানের ২৩৩ অনুচ্ছেদ রয়েছে। তবে প্রেসিডেন্ট জারদারির অনুমোদিত সারসংক্ষেপে এই অনুচ্ছেদের উল্লেখ ছিল না।

খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) চেয়ারম্যান গওহর আলী খান। তিনি এ সিদ্ধান্তকে গুরুতর রাজনৈতিক ভুল ও অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গওহর বলেন, প্রদেশটির মানুষের অধিকার উপেক্ষা করে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা জনগণ মেনে নেবে না। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করে প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।

পিটিআই চেয়ারম্যানের বক্তব্য, খাইবার পাখতুনখাওয়ার জনগণের নির্বাচনী ম্যান্ডেট সাংবিধানিক ও আইনগত অধিকার। প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দুর্বল করে কিংবা কেন্দ্র ও প্রদেশের মধ্যে সংঘাত তৈরি করে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের বিষয়ে তাঁদের কোনো দ্বিমত নেই। তবে সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইকে জনগণের কণ্ঠ দমন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল কিংবা প্রদেশের সাংবিধানিক ক্ষমতা সীমিত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। এ সমস্যা মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য, যৌথ কৌশল, সংবিধানের মর্যাদা এবং অর্থবহ আলোচনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

গওহর আরও জানান, জনগণের ম্যান্ডেট, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন এবং সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় তাঁর দল সব সাংবিধানিক, আইনগত ও গণতান্ত্রিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করবে।

খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি বলেছেন, প্রদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা, মানুষের সমৃদ্ধি এবং উন্নয়ন নিশ্চিত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি প্রদেশের মানুষের প্রতি রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূরে রেখে শান্তি প্রতিষ্ঠায় একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাণ হারানো মানুষদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে কুন্দি বলেন, এসব আত্মত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) এই নেতা আরও বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ যেন প্রদেশের অভিন্ন স্বার্থ, শান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

ফেডারেল মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন, অর্থনীতি স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা ব্যাহত করতে পিটিআই নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারকে সুযোগ দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, পিটিআইকে অর্থনীতি অস্থিতিশীল করতে দেবেন না।

খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তানে সন্ত্রাসবাদ এবং প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ নাগরিক, পুলিশ, নিরাপত্তা সদস্য, শিশু ও নারীদের প্রাণহানিকে অত্যন্ত হৃদয়বিদারক বলে উল্লেখ করেন তিনি। সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পাকিস্তান প্রতিবেশী আফগানিস্তানকে বারবার আহ্বান জানিয়েছে বলেও জানান শাহবাজ।

বৈঠকে সৌদি আরবে হুতিদের সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী হামলার নিন্দা জানান পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক রয়েছে। সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানিয়ে শাহবাজ বলেন, দেশটির বিরুদ্ধে কোনো আগ্রাসন পাকিস্তান সহ্য করবে না।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সাম্প্রতিক স্টাফ-লেভেল চুক্তির বিষয়েও কথা বলেন তিনি। চলতি বছরের মধ্যে আইএমএফের ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের কিস্তি ছাড় হওয়ার আশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। গত মাসে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার সঙ্গে বৈঠকের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

পাকিস্তানের আর্থিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের যৌথ প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন শাহবাজ। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের ভূমিকার প্রশংসা করেন তিনি।