স্বামী মারা গেছেন ১৫ বছর আগে। নেই সন্তান, সৎ ছেলে-মেয়েরাও খোঁজ নেন না। দৃষ্টিশক্তিও প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন। থাকার মতো নিরাপদ ঘর না থাকায় কখনো পরিত্যক্ত সরকারি ভবনে, কখনো প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় রাত কাটে ৫৩ বছর বয়সী লতা রানীর। বিধবা ভাতার সামান্য টাকায় খাবার, চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যয় মেটানোও তাঁর জন্য কঠিন। এমন অসহায় অবস্থায় থাকা লতা রানীর পাশে দাঁড়িয়েছে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা প্রশাসন। সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে লতা রানীর হাতে চারটি শাড়ি এবং চাল, ডাল, চিড়া, তেল, গ্যাস লাইট, মোমবাতি ও খাবার স্যালাইনসহ বিভিন্ন খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। এ উদ্যোগে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন রংপুর পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি রামজীবন কু-ু। প্রেসক্লাব রাজারহাটের সাধারণ সম্পাদক প্রহলাদ মন্ডল সৈকতের মাধ্যমে এসব সহায়তা লতা রানীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এ সময় এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত লতা রানী বলেন, ‘এত দিন অনেক কষ্ট করে দিন কাটিয়েছি। আমার কষ্টের কথা জেনে ইউএনও স্যার আমার পাশে দাঁড়িয়েছেন, পোশাক ও খাবার দিয়েছেন। এতে আমি খুব খুশি হয়েছি। এই সহযোগিতা আমার অনেক উপকারে আসবে। যাঁরা আমার দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। সবাই আমার জন্য আশীর্বাদ করবেন, যেন জীবনের বাকি দিনগুলো একটু শান্তিতে কাটাতে পারি। জাতীয় পরিচয় সূত্রে লতা রানীর বাড়ি রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ডাংঘাট গ্রামে। স্বামী নাটু রায়ের মৃত্যুর পর থেকেই তাঁর জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। গত ১৫ বছর ধরে তিনি একটি পরিত্যক্ত সরকারি ব্লক সুপারভাইজারের কার্যালয়ে (বর্তমানে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয়) বসবাস করছেন। ভবনটির দরজা-জানালা না থাকায় সেখানে রাত কাটানোও নিরাপদ নয়। ফলে অনেক সময় প্রতিবেশীর বাড়ির বারান্দায় আশ্রয় নিতে হয় তাঁকে। সন্তান না থাকায় এবং সৎ ছেলে-মেয়েরা খোঁজখবর না নেওয়ায় দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর মতো আপনজনও নেই। এর মধ্যে দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলায় দৈনন্দিন জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। লতা রানী বিধবা ভাতা পেলেও সেই সামান্য অর্থে খাবার, চিকিৎসা ও নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। বয়স, শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক অনটন মিলিয়ে প্রতিদিনই তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, লতা রানীর তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে খাদ্য ও পোশাকের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তাঁর সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপদ বাসস্থান। দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত ভবনে বসবাস করা এই নারীর জন্য স্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা গেলে তাঁর দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়ার ব্যবস্থাও জরুরি। প্রেসক্লাব রাজারহাটের সাধারণ সম্পাদক প্রহলাদ মন্ডল সৈকত বলেন, ‘লতা রানীর দুরবস্থায় তাঁর পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ অত্যন্ত মানবিক। সমাজের অসহায় মানুষের কষ্ট লাঘবে সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে এলে তাঁদের জীবন কিছুটা হলেও সহজ হবে। আমরা চাই, লতা রানী যেন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পান এবং জীবনের বাকি সময়টুকু নিরাপদে ও একটু শান্তিতে কাটাতে পারেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানজিলা তাসনিম বলেন, ‘লতা রানীর অসহায়ত্বের কথা জানার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাঁকে শুধু একটি শাড়ি দিয়ে নয়, বরং দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারবেন-এমন চারটি শাড়ি ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।