সর্বজনীন- রাজারহাটে শাড়ি উপহার বিতরণে কুড়িগ্রাম ডিসি

এফএনএস (প্রহলাদ মণ্ডল সৈকত; রাজারহাট, কুড়িগ্রাম) : | প্রকাশ: ২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৫৪ এএম
সর্বজনীন- রাজারহাটে শাড়ি উপহার বিতরণে কুড়িগ্রাম ডিসি

 ২০অক্টোবর ২০২৬‘প্রায় একশ বছর আগে লালন ও কাজী নজরুল ইসলাম জাতপাতের বিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। অথচ ২০২৬ সালে এসেও শিক্ষিত সমাজে যদি এ ধরনের সংকীর্ণতা থাকে, তাহলে সেই শিক্ষার মূল্য কোথায়?’-প্রশ্নটি কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের। হরিজন ও রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষের দোকানে গিয়ে চা পান করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা শপথ করেন, তাঁদের দোকানে গিয়ে চা খাবেন।’ সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে হরিজন, রবিদাস ও বেদে সম্প্রদায়ের নারীদের হাতে শাড়ি উপহার বিতরণ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক। জনপ্রশাসনের বিশেষ উদ্যোগে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে রাজারহাট উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ আয়োজন করা হয়। এসময় জেলা প্রশাসক বলেন, দুর্গাপূজা শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব নয়; এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদযাপিত সর্বজনীন আয়োজন। পূজাকে ঘিরে প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ নির্মাণ, বাঁশ ও মাটি সরবরাহ, পরিবহন এবং বিভিন্ন দোকানপাট পরিচালনার সঙ্গে নানা ধর্মের শ্রমজীবী মানুষ যুক্ত থাকেন। কয়েক মাস ধরে চলে প্রতিমা তৈরির কাজ। এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সবার শ্রম ও সহযোগিতা রয়েছে।তিনি বলেন, ‘পূজার ভক্তি সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রকাশ করেন। কিন্তু আয়োজনের সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের শ্রম ও জীবিকা জড়িয়ে আছে। তাই পূজা সর্বজনীন। সব ধর্ম, মত ও পথের মানুষের পারস্পরিক সহযোগিতায় উৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়।’ হরিজন ও রবিদাস সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি সামাজিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ তুলে অন্নপূর্ণা দেবনাথ বলেন, ‘আপনি যদি মনে করেন, মানুষ আপনাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে, আপনার হাতে কেউ খায় না-তাহলে আপনি নিজেই পিছিয়ে যাবেন। আমি তো আপনাদের হরিজন, রবিদাস কিংবা বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে আলাদা করে দেখিনি। মানুষ হিসেবে ভালোবাসা ও সম্মান দিতে চাই।’ তিনি আরও বলেন, ‘নমশূদ্র ও হরিজন সম্প্রদায়ের অনেকেই সচিব ও উপসচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁরা যদি পারেন, তাহলে আপনারা পারবেন না কেন? নিজেদের আগে জাগতে হবে। মনের মধ্যে থাকা সংশয় ও হীনম্মন্যতা দূর করতে হবে।’ জেলা প্রশাসক বলেন, জাতপাতের হিসাব-নিকাশ যেন মানুষের মধ্যে বিভেদের দেয়াল তৈরি করতে না পারে। কোনো মানুষই অন্য মানুষের এগিয়ে যাওয়ার পথে বাধা হবেন না। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মানবিকতা ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তুলতে হবে। নিজের কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি যখন এ এলাকায় জেলা প্রশাসক হয়ে এসেছি, তখন আমাকে নিয়েও অনেক কথা হয়েছে। কিন্তু সে কারণে আমি পিছিয়ে যাইনি। প্রায় এক বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছি। এ সময়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছি। প্রথম দিনই যদি ভয় পেতাম, মনে করতাম মানুষ আমাকে গ্রহণ করছে না কিংবা আমি পারব না, তাহলে আজকের এই পথচলা তৈরি হতো না।’তিনি বলেন, দুর্গাপূজার আয়োজন সার্থক ও সুন্দর করতে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ করাই সবার প্রত্যাশা। অনুষ্ঠানে উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাবেক সভাপতি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সরকার অরুণ যদুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানজিলা তাসনিম, রাজারহাট থানার অফিসার ইনচার্জ মামুনুর রশিদ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ইনচার্জ আবু তাহের, উপজেলা আনসার-ভিডিপির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উজ্জল হোসেন, জেলা মহিলা দলের সদস্যসচিব মিলি বেগম কায়কোবাদ এবং উপজেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শফিকুল ইসলাম। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রেসক্লাব রাজারহাটের সভাপতি আব্দুল কুদ্দুস ও সাধারণ সম্পাদক প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, উপজেলা পূজা উদযাপন ফ্রন্টের সদস্যসচিব রতন রায়, উপজেলা কেন্দ্রীয় মন্দির কমিটির সভাপতি বিষ্ণুপদ মহন্তসহ কমিটির সদস্যরা। এ ছাড়া বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং হরিজন, রবিদাস ও মালি সম্প্রদায়ের নারীরা উপস্থিত ছিলেন।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে