আরজুমান আরার উদ্যোগে টুপি তৈরি করে স্বাবলম্বী শতাধিক নারী

নবাবগঞ্জে ঘরে বসেই তৈরি হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য টুপি

এফএনএস (মোস্তাফিজার রহমান মিলন; হিলি, দিনাজপুর) : | প্রকাশ: ৫ নভেম্বর, ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম
নবাবগঞ্জে ঘরে বসেই তৈরি হচ্ছে রপ্তানিযোগ্য টুপি

প্রত্যন্ত গ্রামের নারীদের অনেকেই সংসারের কাজের বাইরে কিছু করতে চান। নিজের শ্রম ও দক্ষতা কাজে লাগিয়ে পরিবারের বাড়তি আয়ের উৎস হতে চান। কিন্তু প্রশিক্ষণ, কাজের সুযোগ ও ন্যায্য পারিশ্রমিকের অভাবে অনেকের সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়। এমন বাস্তবতায় দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের নয়াপাড়া গ্রামের নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা হয়ে উঠেছেন শতাধিক নারীর কর্মসংস্থানের ভরসা।

তাঁর উদ্যোগে গ্রামের নারীদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন নকশার দৃষ্টিনন্দন নামাজের টুপি। বাড়িতে বসেই এসব টুপি তৈরি করে আয় করছেন নারীরা। আর তাঁদের হাতে তৈরি এসব টুপি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে রপ্তানি হচ্ছে সৌদি আরব, ওমান, পাকিস্তান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও কেনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। এতে একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন গ্রামের অসংখ্য নারী।

জাতীয় কবি কাজি নজরুল ইসলামের ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চিড়-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’—এই চরণ যেন বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন আরজুমান আরা। তাঁর লক্ষ্য কেবল ব্যবসার প্রসার নয়, বরং গ্রামীণ নারীদের শ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলা।

একজন নারী হিসেবে গ্রামের নারীদের সীমাবদ্ধতা, অসহায়ত্ব ও সংগ্রাম খুব কাছ থেকে দেখেছেন আরজুমান আরা। তিনি উপলব্ধি করেন, অনেক নারী সংসারের কাজ সামলে অবসর সময়ে কিছু করতে চান। কেউ হাতের কাজে দক্ষ হলেও কাজের অভাবে সেই দক্ষতা কাজে লাগাতে পারেন না। আবার অনেকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। এসব ভাবনা থেকেই নিজের বাড়িতে নারীদের নিয়ে শুরু করেন টুপি তৈরির কার্যক্রম।

শুরুতে অল্প কয়েকজন নারীকে নিয়ে কাজ শুরু হলেও ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে আগ্রহ। বর্তমানে আশপাশের কয়েকটি গ্রামের শতাধিক নারী এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। সংসারের কাজ শেষে অবসর সময়টুকু তাঁরা কাজে লাগাচ্ছেন টুপি তৈরিতে। একসময় যে সময়ের বড় একটি অংশ মোবাইল ফোন, টেলিভিশন কিংবা গল্প-আড্ডায় কাটত, এখন সেই সময়েই তৈরি হচ্ছে তাঁদের বাড়তি আয়ের পথ।

সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ বসে টুপিতে নকশা তুলছেন, কেউ সুঁই-সুতার নিপুণ ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন বাহারি কারুকাজ। আবার কেউ তৈরি করা টুপি গুছিয়ে রাখছেন। বাড়ির দৈনন্দিন কাজের পাশাপাশি আপন মনে কাজ করছেন নারীরা। তাঁদের চোখেমুখে রয়েছে নিজের উপার্জনে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর তৃপ্তি।

৬৫ বছর বয়সী লাইলী বেগম বলেন, ‘একসময় হাতের কাজ করতাম। এখন বৌমার এখানে টুপি তৈরির কাজ করছি। এলাকায় এ ধরনের কাজের সুযোগ পেয়ে আমার অনেক উপকার হয়েছে। এই বয়সেও যে নিজের হাতে কিছু করে আয় করতে পারছি, তাতে খুব ভালো লাগছে।’

একই গ্রামের মিনু, নিপা, স্বপ্না, তাসলিমা ও সুইটিসহ কয়েকজন নারী জানান, সংসারের কাজের ফাঁকে অবসর সময়ে তাঁরা টুপি তৈরি করেন। এতে মাসে দুই থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আয় হচ্ছে। সেই টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ ও নিজেদের প্রয়োজন মেটাতে পারছেন। আগে ছোটখাটো প্রয়োজনে স্বামীর কাছে টাকা চাইতে হত। এখন নিজের আয় থেকেই অনেক প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হচ্ছে।

তাঁরা বলেন, ‘আগে অবসর সময়ে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন কিংবা গল্প-আড্ডায় সময় কাটত। এখন আরজু আপার উদ্যোগে সেই সময় কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয় করতে পারছি। এতে আমাদের সংসারে যেমন সহযোগিতা হচ্ছে, তেমনি নিজের উপার্জনের একটা আত্মবিশ্বাসও তৈরি হয়েছে।’

আল রাঈন এগ্রো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা বলেন, ‘দেশের অনেক নারী এখনও নানা ধরনের বৈষম্য ও অবহেলার স্বীকার। একজন নারী হিসেবে তাঁদের কষ্ট ও অসহায়ত্ব আমি বুঝি। সংসারের কাজের পাশাপাশি নারীরা যেন নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে কিছু আয় করতে পারেন, সেই চিন্তা থেকেই এ উদ্যোগ নিয়েছি। আমার লক্ষ্য শুধু টুপি তৈরি বা ব্যাবসা করা নয়, গ্রামের নারীদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা।’

তিনি জানান, বর্তমানে তাঁর উদ্যোগে প্রায় ১০০ নারী কাজ করছেন। প্রতিটি টুপি তৈরির জন্য তাঁরা ২৭ টাকা করে পারিশ্রমিক পান। ইতিমধ্যে ১০ হাজার নামাজের টুপি এবং ৫০০টি টুপি কেনিয়ায় রপ্তানি করা হয়েছে। আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশেও টুপি রপ্তানির অর্ডারের কাজ চলমান রয়েছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আরজুমান আরা বলেন, ‘আগামীতে আরও বেশি নারীকে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করতে চাঁই। তবে ব্যবসার পরিধি বাড়াতে প্রয়োজন পুঁজি। অল্প সুদে ঋণ সহায়তা পেলে উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি আরও অনেক নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারব।’

নবাবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শুশ্র প্রকাশ চক্রবর্তী বলেন, ‘নারীরাও সুযোগ পেলে নিজেদের দক্ষতা ও শ্রম দিয়ে পরিবার, সমাজ এবং দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। নবাবগঞ্জের নারী উদ্যোক্তা আরজুমান আরা তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। নারী উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নিতে আমড়া কাজ করছি। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে ক্ষুদ্রঋণসহ নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

গ্রামের নারীদের হাতে তৈরি টুপি এখন পাড়ি দিচ্ছে দেশের সীমানা। সেই টুপির প্রতিটি সেলাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে নারীদের শ্রম, স্বপ্ন আর স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প। আরজুমান আরার ছোট্ট উদ্যোগ যে একদিন আরও বড় পরিসরে গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে দিতে পারে, সেই আশাতেই এগিয়ে চলেছেন নয়াপাড়ার এই নারী উদ্যোক্তা।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে