নাসিরনগরে দুই দিনব্যাপী শুঁটকি মেলা

এফএনএস (আক্তার হোসেন ভূইয়া; নাসিরনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) : | প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
নাসিরনগরে দুই দিনব্যাপী শুঁটকি মেলা

চিরাচরিত বাংলা পঞ্জিকার নিয়ম অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে  বুধবার ও বৃহস্পতিবার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে প্রায় তিনশত বছরের পুরনো  ঐতিহ্যবাহী “শুঁটকি মেলা ও বিনিময় প্রথা”অনুষ্ঠিত হয়েছে । এ মেলায় পণ্যের বিনিময়েও দেওয়া হয়  শুটকি। স্থানীয়রা তাদের পূর্ব- পুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে এ মেলার আয়োজন করে। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের দ্বিতীয় দিন থেকে দুইদিন ব্যাপী এই মেলা বসে উপজেলা সদরের কুলিকুন্ডা উত্তর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে ।

স্থানীয় জনগনের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায়  তিনশত বছরেরও অধিক সময় ধরে এ মেলা বসছে। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে শুঁটকি ব্যবসায়ী ছাড়াও বাহারি শুঁটকির আকর্ষণে দূর-দূরান্ত থেকে ভোজন রসিকরা মেলায় আসেন শুটকি কিনতে। পছন্দের শুঁটকি ক্রয় করে তারা তৃপ্ত হন। প্রায় দুই শতাধিক নানান জাতের শুঁটকির পসরা নিয়ে বসেন দোকানিরা। এসব পসরায় ছিল বোয়াল,গজার, শোল,বাইম, ছুড়ি, লইট্টা, পুটি ও টেংরাসহ নানান জাতের দেশীয় মাছের শুঁটকি। এমন কোন জাতের শুঁটকি নেই যা পাওয়া যায় না।তবে দেশী মাছের শুঁটকির প্রাধান্যই বেশী।এছাড়াও পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকেও আমদানি করা বিভিন্ন প্রজাতির শুটকি উঠে। মেলায় নাসিরনগর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ছাড়াও চট্টগ্রাম, সিলেট ও সুনামগঞ্জের ব্যবসায়ীরা শুঁটকি নিয়ে আসেন। সামুদ্রিক অনেক বিরল জাতের মাছের শুঁটকি ছাড়াও ইলিশ ও কার্প জাতীয় বিভিন্ন জাতের মাছের ডিমও বিক্রি হয়েছে এই মেলায়। এখানে একসময় বিভিন্ন পণ্যের বিনিময়ে শুটকি কেনাবেচা হলেও ধীরে ধীরে বিলুপ্তির পথে এই বিনিময় প্রথা। মূলত শুটকির চড়া দামের কারণে বিনিময় প্রথায় শুটকি বেচাকেনায় আগ্রহ নেই ব্যবসায়ীদের। তবে প্রথা ধরে রাখতে মেলার আনুষ্ঠানিকতা শুরুর ঘণ্টাখানেক সীমিত পরিসরে পণ্যের বিনিময়ে শুটকি কেনাবেচা হয়। আর এ কারণেই ধারণা করা হয় এই মেলার ইতিহাস অনেক পুরনো।

কুলিকুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক  ইউপি সদস্য মো: বিশ্বাস আলী  জানান,তিনশত বছরের বেশী সময় ধরে নিয়মিত ভাবে এই মেলা বসছে। এখনো বহু পুরনো প্রথা প্রচলন থাকায় আমরা ধারণা করছি,এ মেলা আদিম কালের। এই মেলা আমাদের কুলিকুন্ডা গ্রামের ঐতিহ্যবহন করে।মেলা আয়োজনের কোন কমিটি নেই।তারপরও মেলায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করে। কুলিকুন্ডা গ্রামের বাসিন্দা হাজী দাউছ খন্দকার জানান আমাদের বাপ দাদা পইরদাদা আমলেও এ শুঁটকি মেলা ছিল এখনও আছে। শত শত বছরের বেশী সময় ধরে নিয়মিত ভাবে এই মেলা বসছে। সরজমিনে গিয়ে জানা যায়,এবারের মেলায় প্রায় দুইশতাধিক নানা জাতের শুঁটকির পসরা সাজিয়ে বসে দোকানীরা। মেলায় দুইদিনে লাখ লাখ টাকার শুঁটকি বিক্রি হয়েছে। শুঁটকি বিক্রির লাখ লাখ টাকা নিয়ে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে  বাড়ি ফিরে যায়। ঐতিহ্যবাহী এই শুঁটকি মেলাকেন্দ্র করে আশপাশের জমিতে লোকজ মেলা বসে। এছাড়াও মেলায় গৃহস্থালী পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের খেলনা বিক্রি হয়। তবে এবার শুটকীর আমদানি বেশী হলেও দাম ছিল চড়া। স্থানীয়দের মতে ব্যতিক্রম ধর্মী শুটকি মেলার পাশাপাশি পণ্যের বিনিময়ে পণ্য যুগ যুগ ধরে চালু রয়েছে। তবে রীতি দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে।এই মেলা নাসিরনগরের ঐতিহ্যকে প্রদর্শন করে।

মেলাটি সম্পূর্ণ ইজারা মুক্ত। দূর-দুরান্তের ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে ব্যাপারেও কঠোর নজরদারি করা হয় বলেও স্থানীয়রা জানান। আধুনিক সভ্যতার আগে থেকেই বিনিময় প্রথা চালু ছিল। সেই বিনিময় প্রথার ধারাবাহিকতায় নাসিরনগর সদরের লঙ্ঘন নদীর পাড়েও ভোর থেকে  চলে পণ্যের বিনিময়ে পণ্যের বেচাকেনার মেলা। কেউ আসেন ধান, চাল, আলু, গম নিয়ে আবার কেউ সরিষা, মরিচ নানা সবজি নিয়ে আসেন। এসব বিনিময়ের মাধ্যমে তারা নিচ্ছেন শুটকি। কি পরিমাণ শুটকি দেয়া হবে সেটা নিয়ে এখানে চলে দর কষাকষি। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় এই পণ্যের বিনিময়ে পণ্য দেয়ার বাজারের কার্যক্রম। এখানে মহিলাদের উপস্থিতিই বেশি।  এখানে বিক্রি হয় মৃৎশিল্পীদের হাতের তৈরি মাটির হাঁড়ি ও তৈজসপত্র।স্থানীয় কুমারদের হাতের তৈরি হাড়িঁ,পাতিল, কলস,ঝাঁঝর,থালা,ঘটি,বদনা,বাটি ,পুতুল ও প্রদীপ মেলায় মানুষের নজরকাড়ে। গ্রাম্য মেয়েদের সামান্য পয়সা সংগ্রহের জন্য নানা ডিজাইনের মাটির ব্যাংকও বিক্রি হয় এ মেলায়।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে