চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়ায় বরিশালে তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। এতে ঘণঘণ লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পরেছেন নগরী ও জেলার বাসিন্দারা। বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ না পাওয়ায় ঘণঘণ লোডশেডিং করা হচ্ছে।
জানা গেছে, বরিশাল-ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার একাংশের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ন্ত্রিত হয় বরিশালের দুইটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে। এখানে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ২৮০ মেগাওয়াট। তবে বিদ্যমান দুই সাব-স্টেশনের সক্ষমতা এখনো সেই চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতিবছর গ্রীষ্মে তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি ছাড়ালেই কেবল এতো বিদ্যুৎ দরকার হয় এখানে। বুধবার বরিশালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সময়ে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট। অথচ দুইদিন পিক আওয়ারে ১৫০ মেগাওয়াট করে পাচ্ছে বরিশাল। বাকি ১০০ মেগাওয়াটের চাহিদা সামাল দিতে চলছে লোডশেডিং। বরিশাল নগরীতে থাকা ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির দুটি বিভাগ সূত্রে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এখানে ৩৫টি ফিডারের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয় বিদ্যুৎ। নগরীতে থাকা এই ৩৫টি ফিডারে বর্তমানে বিদ্যুতের মোট চাহিদা ৯৫ মেগাওয়াট। কিন্তু বুধবার দুপুর থেকে ৬০ মেগাওয়াটের বেশি আসছে না জাতীয় গ্রিড থেকে। ফলে প্রতিটি ফিডারে গড়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার বেশি সময় বন্ধ রাখা হচ্ছে বিদ্যুৎ।
বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল ছাড়াও বিদ্যুৎ যায় ঝালকাঠি, মাদারীপুরের একাংশ ও পিরোজপুরের স্বরূপকাঠীতে। ঝালকাঠি জেলা সদর ও নলছিটি উপজেলা মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১২ মেগাওয়াট। স্বরূপকাঠীতে অবশ্য চাহিদা খুব একটা বেশি নয়। বরিশালের দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন থেকে বরিশাল নগরী ও জেলার নয়টি উপজেলাসহ মাদারীপুরের কিছু এলাকায়ও বিদ্যুৎ যায়। এসব উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ আবার নিয়ন্ত্রণ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। এছাড়া বাকেরগঞ্জে থাকা গ্রিড সাব-স্টেশনের মাধ্যমে ১৫/২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ওই উপজেলা ও সংলগ্ন কিছু এলাকায়।
বরিশালে যে দুটি গ্রিড সাব-স্টেশন রয়েছে, তারমধ্যে রূপাতলী সাব-স্টেশনের আওতাধীন এলাকায় বুধবার বিকেল তিনটায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ১২০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে জাতীয় গ্রিড থেকে তারা পেয়েছে ৮৯ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। একই সময়ে কাশিপুর কলাডেমা সাব-স্টেশন চাহিদার ১৩০ মেগাওয়াটের বিপরীতে পেয়েছে ৬৬ মেগাওয়াট। হিসেব অনুযায়ী সরবরাহ কম ছিল প্রায় ৯৫ মেগাওয়াট। এক্ষেত্রে নগরাঞ্চলে চাহিদার প্রায় ৭০ ভাগ সরবরাহ করা হলেও গ্রামাঞ্চলে দেওয়া হয়েছে ৫০ ভাগেরও কম। ফলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতায় থাকা মানুষকে সইতে হয়েছে সবচেয়ে দুর্ভোগ। এদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পরেছেন সাধারণ মানুষ। বেশি ক্ষতির শিকার ব্যবসায়ীরা। এমনিতেই সন্ধ্যা সাতটা থেকে দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। তার ওপর দিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় ক্রেতা মিলছে না দোকানে। বিপাকে পরছে শিক্ষার্থীরাও। ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষা। লোডশেডিংয়ের কারণে তাদের লেখাপড়ায়ও ঘটছে বিঘ্ন।
বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা সৈয়দ কাওসার আহমেদ বলেন, এবার গ্রীষ্ম শুরু হতে না হতেই বিদ্যুতের যে পরিস্থিতি দেখছি তাতে পুরোপুরি গরম শুরু হলে কী হবে তাই ভেবে ভয় হচ্ছে। আমাদের এখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ। এখনই তো দিন-রাত মিলিয়ে গড়ে ৫ থেকে ৬ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। জেলার মুলাদী উপজেলার বাসিন্দা রাকিব হোসেন বলেন, আর কয়েকদিন পরেই এসএসসি পরীক্ষা। এভাবে ঘণঘণ বিদ্যুৎ গেলে পরীক্ষার্থীরা লেখাপড়াই করতে পারবে না। বিদ্যুতের এই বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আর দোকান মালিকরা। তারা সন্ধ্যা সাতটা থেকে দোকানপাট বন্ধ রাখার নির্দেশে বেশি ভোগান্তিতে পরছেন। বরিশাল নগরীর গীর্জামহল্লা এলাকার ব্যবসায়ী নুরুল আলম বলেন, জ্বালানি সাশ্রয়ে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকানপাট বন্ধ করতে বলেছে সরকার। এরইমধ্যে সেই নির্দেশনার বাস্তবায়নও শুরু হয়েছে। এদিকে দিনে যদি ৩/৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে কীভাবে ব্যবসা করব? বিদ্যুৎ না থাকলে তো দোকানে ঢোকেনা কাস্টমার। এভাবে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা যাবে না। ফজলুল হক অ্যাভিনিউর ব্যবসায়ী আকতার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে অনেক ব্যবসায়ী এখন জেনারেটর চালান। এই জেনারেটর চলে তেলে। তাহলে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য এই যে লোডশেডিং, তাতে কি লাভ হলো?
বুধবার পিডিবি নিয়ন্ত্রণাধীন পলাশপুর সাব-স্টেশন দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান, তার সাব-স্টেশনের আওতায় সাতটি ফিডারের মাধ্যমে চলে বিদ্যুৎ সরবরাহ। মূলত নগরীর প্রাণকেন্দ্র সদর রোডসহ গীর্জামহল্লা, কাটপট্টি, বাজার রোডসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো রয়েছে এই সাব-স্টেশনের আওতায়। বর্তমান সময়ে পিক আওয়ারে এই সাব-স্টেশনের আওতাধীন এলাকাগুলোয় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১৮ মেগাওয়াট।
বুধবার সন্ধ্যা ছয়টায় জাতীয় গ্রিড থেকে এই সাব-স্টেশনকে দেওয়া হয় মাত্র ৮ মেগাওয়াট। বাকি ১০ মেগাওয়াটের চাহিদা সামলাতে প্রতিবার দুইটি করে ফিডারে লোডশেডিং দিতে হচ্ছিল তাদের। একঘণ্টা পরপর চলছিল এই লোডশেডিং। ফলে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে তিনঘণ্টা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় ছিল এই সাব-স্টেশনের আওতাধীন এলাকাগুলো। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় রাতেও চলে লোডশেডিং। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি বরিশাল-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্নকার বলেন, দুইদিন ধরে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছি না আমরা। হয়তো কোনো সমস্যা হয়েছে। এখন পর্যন্ত আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু দেখছি না। ডিস্ট্রিবিউশন লাইনে সমস্যা কিংবা উৎপাদনকেন্দ্রের জটিলতার কারণে এটা হতেই পারে। শীঘ্রই এ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।