৩০০ কৃষক পরিবারের রাতের ঘুম হারাম

খালের লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সেচ সংকটের ঝুঁকিতে ধানসহ সবজির আবাদ

এফএনএস (কুয়াকাটা, পটুয়াখালী) : | প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
খালের লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়ায় সেচ সংকটের ঝুঁকিতে ধানসহ সবজির আবাদ

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় নীলগঞ্জের মিঠা পানির গুরুত্বপূর্ণ উৎস নাওভাঙা খালকে কেন্দ্র করে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে। প্রায় ছয় থেকে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ এবং দেড় থেকে দুইশ’ ফুট প্রস্থের এই খালটি বহু বছর ধরে আশপাশের চারটি গ্রামের কৃষকের কৃষি উৎপাদনের প্রধান ভরসা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সমপ্রতি খালটি মৎস্য চাষের জন্য ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে-এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় অন্তত ৩০০ কৃষক পরিবারের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। তাঁদের রাতে ঘুম হারাম হয়ে গেছে। কৃষকরা জানান, ১৪৩২ সালের শেষের দিকে এই খালটি লিজ দেওয়ার কথা তারা শুনেছেন। এবং খালের দখল নিতে একটি মহল প্রাথমিক কর্মকান্ড শুরু করেছে।

নাওভাঙা খালটি নিজকাটা স্লুইস খালের সঙ্গে সংযুক্ত এবং এর পূর্ব প্রান্ত গিয়ে মিশেছে পাখিমারা খালে। খালের পূর্ব পাশ দিয়ে কুয়াকাটাগামী মহাসড়ক অতিক্রম করেছে, যেখানে পানি চলাচলের জন্য দুটি ভেন্টসহ একটি বক্স কালভার্ট রয়েছে। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে খালটি স্বাভাবিকভাবে পানি ধারণ ও সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে কাজ করে।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, এই খালের সংরক্ষিত মিঠা পানির ওপর নির্ভর করেই নাওভাঙা, গুটাবাছা, চাঁদপাড়া এবং পাখিমারা গ্রামের একাংশের কৃষকরা আমন ধানের পাশাপাশি বোরো ও বিভিন্ন রবিশস্যের আবাদ করে থাকেন। চলতি মৌসুমে অন্তত এক হাজার একর জমিতে বোরো ধানের চাষ হয়েছে এই খালের পানির সেচের মাধ্যমে। এছাড়া সবজি চাষেও খালটির পানির উপর কৃষকরা নির্ভরশীল। সেচের কারণে খালটি এখন পানিশুণ্য। কৃষকদের আশঙ্কা, খালটি ইজারা দিয়ে মাছ চাষ শুরু হলে সেখানে লোনা পানি প্রবেশ করানো হবে, যা পুরো কৃষি ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এতে শুধু বোরো ধান নয়, বরং সব ধরনের রবিশস্য ও সবজি আবাদও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিপূর্বে ইজারাদারের লোকজন এমন প্রকিূল পরিবেশ তৈরি করেছিল। পানি থাকলেও সেচ দিতে পারবেন না।

গুটাবাছা গ্রামের কৃষক মিলন তালুকদার জানান, তিনি ৪০ বিঘা জমিতে হাইব্রিড বোরো ধানের আবাদ করেছেন। ফলনও ভালো হয়েছে। খালের পানি দিয়ে সেচের কাজ প্রায় শেষ করেছেন। খালের পানি শুকিয়ে গেছে, তাই এখন অতিরিক্ত সেচের জন্য ডিপ টিউবওয়েল ব্যবহার করতে হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যেই ধান ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। কিন্তু কৃষকরা খালের নিয়ন্ত্রণ হারালে ভবিষ্যতে এমন আবাদ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না বলে আশঙ্কা তার।

অন্যদিকে, কৃষক ইব্রাহিম খান ৬০ শতক জমিতে করলা চাষ করছেন। বীজ ও জমি প্রস্তুতিসহ ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। জাকির ফকির আট বিঘা জমিতে করলা চাষে এক লাখ টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। একইভাবে ইসমাইল মীরও দুই বিঘা জমিতে করলা আবাদ করেছেন। তাদের সকলেরই সেচের প্রধান উৎস এই নাওভাঙা খাল। তারাও খালের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হলে জীবন-জীবিকার পেশা কৃষিকাজ বন্ধের শঙ্কায় পড়েছেন। মানুষগুলো দিশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। খাল লিজের খবরটি যেন তাঁদের কাছে মহাবিপদ শঙ্কেত হয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে।

কৃষক সুলতান গাজী বলেন, “খালটি লিজ দেওয়া হলে আমরা সেচ তো দূরের কথা, পানি ব্যবহার করতেও পারব না। এতে আমাদের চাষাবাদ, হাঁস-মুরগি পালন, এমনকি দৈনন্দিন জীবনযাপনও ব্যাহত হবে।” তিনি আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, লোনা পানি প্রবেশ করলে তা পাখিমারা খাল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে এবং এতে শত কোটি টাকার কৃষি উৎপাদন ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

স্থানীয় কৃষকদের আরো অভিযোগ, খালটির প্রকৃত আয়তন হবে প্রায় ২০০ একর। খালটির মাধ্যমে তাঁদেও জীবন-জীবিকার চাকা সচল থাকছে। খালটি আবার ইজারার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় কৃষকরা উপজেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, প্রয়োজনে নিজেরাই চাঁদা তুলে সরকারের রাজস্ব পরিশোধ করতে রাজি আছেন, তবুও খালটির নিয়ন্ত্রণ কোনো প্রভাবশালী মহলের হাতে যেন তুলে দেওয়া না হয়। কৃষকরা দাবি করেন, কোন ধরনের বাস্তবতা নিরুপণ না করে কৃষি বিভাগ কিংবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের মতামত না নিয়ে একটি নির্দিষ্ট মহল জেলা প্রশাসনের তালিকায় খালগুলো ইজারা দেওয়ার জন্য তালিকাভুক্ত করানো হয়। ফলে কৃষিকাজের ভয়াবহ সমস্যা দেখা দেয়। আর এ কারণে কৃষকের জীবন-জীবিকা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্ধ হয় কৃষি উৎপাদন। কৃষকদের মতে, বিষয়টি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়; বরং জাতীয় কৃষি উৎপাদনের সঙ্গেও জড়িত। তাই মানবিক দিক বিবেচনায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। অপরদিকে অসংখ্য কৃষক জানিয়েছেন খালের নিয়ন্ত্রণ তাঁদের হাতছাড়া করলে তারা যে কোনমূল্যে প্রতিহত করবেন। কারণ তাঁদের জীবন-জীবিকার প্রশ্নে তারা কোন প্রভাবশালী মহলের কাছে আপোস করতে রাজি নন। এতে করে চারটি গ্রামে অসন্তোষ তৈরি হবে। আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটার শঙ্কা রয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেক জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে কৃষকের সঙ্গে কথা বলে কৃষিকাজের স্বার্থ যাতে ক্ষতি না হয় এমন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানালেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কাউছার হামিদ জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসনের সভায় উপস্থাপন করবেন। কৃষকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোন পদক্ষেপ নেয়া হবে না।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে