ক্ষেতলালে সারের বাড়তি দামে বিপাকে কৃষক

এফএনএস (মোঃ হাসান আলী মন্ডল; ক্ষেতলাল, জয়পুর হাট) : | প্রকাশ: ২২ আগস্ট, ২০২৬, ০৫:৪৮ পিএম
ক্ষেতলালে সারের বাড়তি দামে বিপাকে কৃষক

জয়পুরহাটের ক্ষেতলালে চলতি আমন মৌসুমে সার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তাপ্রতি ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে কিছু ডিলার ও ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। বাড়তি দাম নেওয়ার পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে রসিদ বা মেমো দেওয়া হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। এতে আমন ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন তারা। ক্ষেতলালে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় প্রায় ১২ হাজার হেক্টর তিন ফসলি জমি রয়েছে। চলতি আমন মৌসুমে ১০ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় ৯৭ শতাংশ জমিতে ধানের চারা রোপণ শেষ হয়েছে। বর্তমানে কৃষকেরা জমিতে উপরি সার প্রয়োগসহ পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।

কৃষি অফিস সূত্রে আরও জানা গেছে, উপজেলায় বিসিআইসি ও বিএডিসির মোট ৪১ জন সার ডিলার রয়েছেন। চলতি আগস্ট মাসে বিএডিসির টিএসপি ২০৬ মেট্রিক টন, এমওপি ৩৭০ মেট্রিক টন এবং ডিএপি বিসিআইসির ৪৩ ও বিএডিসির ২০২ মেট্রিক টন বরাদ্দ ও উত্তোলন করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউরিয়ার মোট বরাদ্দ ৮৬৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে ৭৮০ মেট্রিক টন উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি রয়েছে ৮৩ মেট্রিক টন। কৃষকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকার কথা বলা হলেও বাজারে সরকার নির্ধারিত দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৩৫০, টিএসপি ১ হাজার ৩৫০, এমওপি ১ হাজার এবং ডিএপি ১ হাজার ৫০ টাকা দরে বিক্রির কথা থাকলেও বাস্তবে এসব সার কিনতে হচ্ছে বেশি দামে।

নশিরপুর গ্রামের কৃষক রানা বলেন, এ বছর চার একর জমিতে আমন ধান চাষ করেছি। ধান রোপণের ২০ দিন হয়েছে। এখন উপরি সার দিতে হবে। আমার তিন বস্তা টিএসপি, তিন বস্তা এমওপি ও তিন বস্তা ইউরিয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাজারে একসঙ্গে বেশি সার দেওয়া হচ্ছে না। কোথা থেকে প্রয়োজনীয় সার পাব, বুঝতে পারছি না। তিনি অভিযোগ করেন, নির্ধারিত ১ হাজার ৩৫০ টাকার ইউরিয়ার বস্তা ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকায়, টিএসপি ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকা, ডিএপি ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা এবং এমওপি প্রায় ১ হাজার ৪০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

ভাশিলা গ্রামের আহমদ ও গোলাহার গ্রামের বাবুসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, দোকানে সরকার নির্ধারিত মূল্যের তালিকা ঝুলিয়ে রাখা হলেও বাস্তবে ওই দামে সার পাওয়া যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীরা সংকটের কথা বলে বাড়তি টাকা নিচ্ছেন। আবার মেমো চাইলে অনেক সময় তা দিতে অনীহা দেখানো হচ্ছে।

কৃষকেরা আরও বলেন, সার, কীটনাশক, চাষ ও সেচসহ কৃষির অন্যান্য উপকরণের খরচ বেড়েছে। কিন্তু ধানের দাম সে অনুযায়ী বাড়ছে না। এভাবে উৎপাদন খরচ বাড়তে থাকলে আমন চাষে লোকসান গুনতে হবে।

চৌমুহনী বাজারের সার ডিলার আব্দুস সামাদ বাবু বলেন, আমরা প্রতি মাসে যে পরিমাণ সার বরাদ্দ পাই, তার শতভাগই সরকারি নির্ধারিত মূল্যে কৃষকদের কাছে বিক্রি করি। তবে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী রাতের আঁধারে কালোবাজারির মাধ্যমে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বৈধ ডিলারদের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সার ডিলার সমিতির সভাপতি রওনকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, চাহিদার তুলনায় সারের প্রাপ্যতা কিছুটা কম। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় কোথাও স্বল্পমেয়াদি সমস্যা হলে প্রশাসনের নজরে এনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ডিলার বা অনিবন্ধিত খুচরা বিক্রেতা সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রি করলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলায় সারের বড় ধরনের সংকট নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

ক্ষেতলাল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মল্লিকা রানী সেহানবীশ বলেন, এ উপজেলায় সারের কোনো সংকট নেই। চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কোনো ডিলার সরকার নির্ধারিত মূল্যের বেশি দামে সার বিক্রি করলে অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি সার প্রয়োগ করেন। পাশাপাশি আগামী আলু মৌসুমের জন্য কিছু কৃষক এখন থেকেই সার সংরক্ষণের চেষ্টা করছেন। এসব কারণেও সাময়িক চাপ তৈরি হতে পারে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ কৃষি বিভাগের মনিটরিং ব্যবস্থা চলমান রয়েছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার জেলার সংবাদ পড়তে